একজন মানুষের ফুসফুসে পাওয়া কালো আঠালো পদার্থ দেখাল দাবানলের ধোঁয়ার আরও ভয়ংকর দিক
ডাক্তারদের মতে, কয়েক ঘণ্টা ধরে ঘন ধোঁয়া শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করার ফলে এই অদ্ভুত ক্ষতি হয়েছিল।
ডাক্তাররা রোগীর শ্বাসনালীর ভেতর থেকে যে “ব্রঙ্কিয়াল কাস্ট” (bronchial casts) বের করেছেন।
এই মাসে প্রকাশিত একটি কেস রিপোর্ট স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে বন আগুন আমাদের ফুসফুসের কতটা ক্ষতি করতে পারে।
চীনের ডাক্তাররা এমন এক ব্যক্তির চিকিৎসা করেন, যিনি বন আগুনের ঘন ধোঁয়া শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করেছিলেন। তার শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্ষমতা কমে যেতে শুরু করলে ডাক্তাররা তার শ্বাসনালী পরীক্ষা করেন এবং দেখতে পান যে সেগুলো রাবারের মতো কালো হয়ে যাওয়া শ্লেষ্মা (মিউকাস) দিয়ে ভরে গেছে, যা ধোঁয়া শ্বাস নেওয়ার কারণে তৈরি হয়েছিল।
সৌভাগ্যবশত, তারা সফলভাবে সেই আঠালো পদার্থ সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হন এবং শেষ পর্যন্ত রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।
ব্রঙ্কিয়াল কাস্ট (Bronchial Casts)
রিপোর্ট অনুযায়ী, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় ওই ব্যক্তি জরুরি বিভাগে যান। তার আগে কয়েক ঘণ্টা ধরে তিনি বন আগুনের ঘন ধোঁয়ার মধ্যে ছিলেন।
তিনি পুড়ে যাওয়া থেকে বেঁচে গেলেও, তার শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে গিয়েছিল। অবস্থার অবনতি হওয়ায় ডাক্তাররা তাকে ইনটিউবেট করেন (শ্বাসনালীতে টিউব বসান) এবং ভেন্টিলেশনে রাখেন। কিন্তু ভেন্টিলেশন প্রত্যাশামতো কাজ করছিল না। ফলে ডাক্তাররা একটি নমনীয় টিউব ও ক্যামেরা (ব্রঙ্কোস্কপি) দিয়ে তার ফুসফুস ও শ্বাসনালী পরীক্ষা করেন।
তখনই তারা “ব্রঙ্কিয়াল কাস্ট” বা “প্লাস্টিক ব্রঙ্কাইটিস” নামে পরিচিত একটি অবস্থা দেখতে পান।
ব্রঙ্কিয়াল কাস্ট তৈরি হয় শ্বাসনালিতে মিউকাস, লিম্ফ তরল এবং অন্যান্য পদার্থ জমে যাওয়ার ফলে। এতে রাবারের মতো মোটা প্লাগ বা স্তর তৈরি হয়, যা শ্বাসনালীকে ভরে ও ব্লক করে দেয়। এর ফলে গুরুতর, এমনকি প্রাণঘাতী শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
ডাক্তাররা নিশ্চিত হন যে রোগীর এই কাস্টগুলো বন আগুনের ধোঁয়ার ক্ষুদ্র কণিকা (particulate matter) শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করার ফলেই তৈরি হয়েছে, যার কারণে এগুলো কালচে রঙ ধারণ করেছিল।
কিছু ক্ষেত্রে এই কাস্ট কাশি দিয়ে বের হয়ে আসতে পারে, কিন্তু গুরুতর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। ডাক্তাররা “ক্রায়োপ্রোব” ব্যবহার করে এই কাস্টগুলো সরিয়ে ফেলেন।
তিন দিন পর রোগীকে ইনটিউবেশন থেকে সরানো হয় এবং তাকে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা দেওয়া হয়। এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকার পর তিনি ছাড়পত্র পান।
দুই সপ্তাহ পর ফলো-আপে দেখা যায়, তার শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।
এই রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছে New England Journal of Medicine-এ।
জলবায়ু পরিবর্তনের লুকানো প্রভাব
এই ঘটনা শুধু একটি অদ্ভুত চিকিৎসা চিত্রই নয়—এটি জলবায়ু পরিবর্তনের কম দৃশ্যমান ক্ষতির দিকও তুলে ধরে।
এই রিপোর্টটি ওই জার্নালের চলতি সংখ্যার একটি সিরিজের অংশ, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে পারে এমন বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।
বিশ্বের অনেক অঞ্চলে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে গত কয়েক দশকে দাবানলের মাত্রা বেড়েছে। এবং যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো না হয়, তবে ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তাই এই ধরনের ধোঁয়া-সম্পর্কিত শ্বাসযন্ত্রের ক্ষতি এখন বিরল হলেও, ভবিষ্যতে তা আরও সাধারণ হয়ে উঠতে পারে।