কোরআনে হারুত-মারুত: প্রচলিত কাহিনী বনাম নির্ভরযোগ্য ইসলামী সূত্র
ইসলামী ইতিহাস ও তাফসিরের আলোচনায় হারুত ও মারুত এমন দুটি নাম, যাদের ঘিরে বহু কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাবিলনে তাদের আগমন, জাদুবিদ্যার শিক্ষা এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু রোমাঞ্চকর গল্প মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব কাহিনীর কতটুকু কোরআন দ্বারা প্রমাণিত? আর কতটুকু পরবর্তী সময়ের প্রচলিত বর্ণনা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের প্রথমে ফিরে যেতে হবে পবিত্র কোরআনের সেই গুরুত্বপূর্ণ আয়াতে, যেখানে সরাসরি হারুত ও মারুতের কথা এসেছে।
আল্লাহ বলেন, সূরা আল-বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে, সুলাইমান (আ.)-এর রাজত্বকালে শয়তানরা মানুষের মধ্যে জাদুবিদ্যার প্রচার করত। সুলাইমান (আ.) জাদু করেননি এবং অবিশ্বাসীও ছিলেন না; বরং শয়তানরাই মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত। এরপর ব্যাবিলনে হারুত ও মারুত নামে দুই ফেরেশতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তারা কাউকে শিক্ষা দেওয়ার আগে সতর্ক করে বলত—
“আমরা তো কেবল পরীক্ষা; অতএব তুমি কুফরি করো না।”
এরপর মানুষ তাদের কাছ থেকে এমন বিষয় শিখত, যার মাধ্যমে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো হতো। তবে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা এর মাধ্যমে কারও কোনো ক্ষতি করতে পারত না।
প্রচলিত কাহিনী ও কোরআনের বক্তব্য
হারুত ও মারুতকে নিয়ে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গল্প হলো—তারা নাকি মানুষের রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে এসেছিলেন। এরপর তারা একজন সুন্দরী নারী, যাকে অনেক বর্ণনায় “জোহরা” নামে উল্লেখ করা হয়, তার প্রতি আকৃষ্ট হন। পরে মদ্যপান, ব্যভিচার, শিশুহত্যা ইত্যাদির মতো নানা ঘটনা তাদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
কিছু বর্ণনায় বলা হয়, তারা শাস্তি হিসেবে ব্যাবিলনের একটি কূপে উল্টোভাবে ঝুলন্ত অবস্থায় কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে এবং সেই নারী পরবর্তীতে শুক্রতারা বা Venus-এ পরিণত হয়।
তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই বিস্তারিত কাহিনীটি সূরা আল-বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে নেই।
কোরআন হারুত ও মারুতের প্রসঙ্গে তাদের পরীক্ষা, জাদু সম্পর্কে সতর্কতা এবং মানুষের শেখা জাদুর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের বিষয় উল্লেখ করেছে। কিন্তু জোহরা, মদ্যপান, ব্যভিচার, শিশুহত্যা কিংবা শুক্রতারা হয়ে যাওয়ার মতো অতিরিক্ত বিবরণকে কোরআনের নিশ্চিত বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
তাফসিরের প্রাচীন গ্রন্থগুলোতেও এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন মত ও বর্ণনা পাওয়া যায়। ইবন কাসিরের তাফসিরে বিভিন্ন মতামত ও বর্ণনার আলোচনা রয়েছে। তাই জনপ্রিয় কোনো গল্পকে সরাসরি কোরআনের ঘটনা হিসেবে প্রচার না করে কোন অংশটি কোরআন দ্বারা প্রমাণিত এবং কোনটি পরবর্তী বর্ণনা—তা আলাদা করা জরুরি।
সুলাইমান (আ.) ও জাদুর প্রসঙ্গ
হারুত ও মারুতের ঘটনা বুঝতে হলে সুলাইমান (আ.)-এর প্রসঙ্গটি বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ সুলাইমান (আ.)-কে অসাধারণ ক্ষমতা ও বিশাল রাজত্ব দান করেছিলেন। তাঁর অধীনে জিনদের একটি অংশ কাজ করত এবং আল্লাহর অনুমতিতে তারা বিভিন্ন ধরনের কাজ সম্পাদন করত।
কোরআনে সুলাইমান (আ.) সম্পর্কে এমন কোনো বক্তব্য নেই যে তিনি জাদু ব্যবহার করতেন। বরং সূরা আল-বাকারা ১০২ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—
“সুলাইমান কুফরি করেনি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল। তারা মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত।”
অর্থাৎ সুলাইমান (আ.)-এর সঙ্গে জাদুকে যুক্ত করে তাকে একজন জাদুকর হিসেবে উপস্থাপন করা কোরআনের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।
ব্যাবিলনে হারুত ও মারুত
সূরা আল-বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে ব্যাবিলনের কথা এসেছে। সেখানে হারুত ও মারুত নামে দুই ফেরেশতার উল্লেখ রয়েছে।
আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা কাউকে কোনো বিষয় শেখানোর আগে সতর্ক করত—
“আমরা তো কেবল পরীক্ষা; অতএব তুমি কুফরি করো না।”
এই সতর্কবার্তাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে বিষয়টি ছিল একটি পরীক্ষা। জ্ঞান বা ক্ষমতা নিজে মানুষের জন্য সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়; মানুষ সেই জ্ঞান কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
“আমরা তো কেবল পরীক্ষা”—এই সতর্কবার্তার অর্থ
হারুত ও মারুতের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হলো—মানুষকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ বিষয়টি এমন ছিল না যে মানুষ কোনো সতর্কতা ছাড়াই একটি বিপজ্জনক জ্ঞান অর্জন করেছিল।
তাদের বলা হয়েছিল, এটি পরীক্ষা এবং এর মাধ্যমে অবিশ্বাসের পথে যাওয়া যাবে না।
এখানে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা রয়েছে—মানুষের কাছে কোনো ক্ষমতা বা জ্ঞান আসা মানেই সেটি ইচ্ছামতো ব্যবহার করার অনুমতি নয়।
জ্ঞান যেমন কল্যাণের কারণ হতে পারে, ভুল ব্যবহারে সেটিই মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের প্রসঙ্গ
কোরআন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে মানুষ হারুত ও মারুতের কাছ থেকে এমন কিছু শিখত, যার মাধ্যমে একজন পুরুষ ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো সম্ভব হতো।
তবে একই আয়াতে আল্লাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখাও দিয়েছেন—
“তারা এর মাধ্যমে কারও ক্ষতি করতে পারে না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া।”
এখানে ইসলামী আকিদার একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট হয়—কোনো শক্তি বা মাধ্যম স্বাধীনভাবে আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে কাজ করতে পারে না।
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো ক্ষতি সম্ভব নয়
জাদু সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মানুষের মনে এই বিশ্বাস তৈরি না করা যে কোনো ব্যক্তি বা জাদুকর স্বাধীনভাবে মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো ক্ষতি সংঘটিত হতে পারে না।
এর অর্থ এই নয় যে জাদুর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে। বরং কোরআন জাদুর বিষয়টি উল্লেখ করেছে এবং এর ক্ষতিকর প্রভাবের কথাও জানিয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের বিশ্বাসকে আল্লাহর ক্ষমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সুতরাং কোনো জাদুকর, তান্ত্রিক বা অন্য কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এমন ধারণা করা যে সে নিজস্ব ক্ষমতায় মানুষের জীবন, মৃত্যু, ভাগ্য কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—এটি ইসলামী তাওহিদের মৌলিক ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
হারুত-মারুতের ঘটনায় তাফসিরের মতভেদ
হারুত ও মারুতের ঘটনাকে ঘিরে প্রাচীন তাফসিরে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়।
বিশেষ করে তারা সত্যিই ফেরেশতা ছিলেন কি না, তাদের শিক্ষাদানের প্রকৃতি কী ছিল এবং আয়াতের কিছু শব্দ কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে—এসব বিষয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
ইবন কাসিরের তাফসিরেও বিভিন্ন মত ও প্রাচীন বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। তাই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার সময় একটি নির্দিষ্ট লোককাহিনীকে একমাত্র ইসলামী ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা সতর্কতার দাবি রাখে।
জোহরা ও অন্যান্য প্রচলিত গল্প কতটা নির্ভরযোগ্য?
জোহরা নামের নারী, তার প্রতি হারুত-মারুতের আকর্ষণ, মদ্যপান, ব্যভিচার, শিশুহত্যা, শুক্রতারা হয়ে যাওয়া এবং কূপে ঝুলিয়ে রাখার মতো বিবরণ বহু জনপ্রিয় আলোচনায় পাওয়া যায়।
কিন্তু এসব বিবরণ কোরআনের সরাসরি বক্তব্য নয়।
তাই কোনো ইসলামি পোস্ট, ভিডিও বা বক্তব্যে এসব কাহিনী উপস্থাপন করলে তা “কোরআনে বর্ণিত ঘটনা” না বলে “প্রচলিত বর্ণনা” বা “কিছু তাফসিরি সূত্রে উল্লেখিত কাহিনী” হিসেবে উল্লেখ করা অধিক সতর্ক ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।
বিশেষ করে যখন কোনো বিষয় আকিদা, নবী-রাসুল বা ফেরেশতাদের সঙ্গে সম্পর্কিত, তখন যাচাই না করে আবেগনির্ভর গল্পকে ইসলামের নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর জাদুর ঘটনা
সহিহ হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর জাদুর ঘটনা সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। সহিহ মুসলিমে এ বিষয়ে হাদিস এসেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাসুলুল্লাহ ﷺ অসুস্থ অবস্থায় মু‘আউয়িযাতাইন, অর্থাৎ সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস পাঠ করে নিজের ওপর ফুঁ দিতেন—এমন বর্ণনাও সহিহ মুসলিমে এসেছে।
তাই জাদু বা অশুভ প্রভাবের আশঙ্কায় ইসলামীভাবে দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত ও শরিয়তসম্মত রুকইয়াহর গুরুত্ব রয়েছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট সূরা কেবল একটি ঘটনার কারণে নাজিল হয়েছে—এমন দাবি করার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য দলিল থাকা জরুরি।
ইসলামে জাদুর অবস্থান
ইসলামে জাদু অত্যন্ত গুরুতর ও নিষিদ্ধ বিষয়।
সহিহ মুসলিমে জাদুকে সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে কোনো ব্যক্তি জাদুর সঙ্গে জড়িত হলেই তাকে নিজের পক্ষ থেকে কাফির ঘোষণা করা সাধারণ মানুষের কাজ নয়। ব্যক্তির কাজ, বিশ্বাস, উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শরিয়তের বিধান আলাদা করে বিবেচনা করতে হয়।
তাই “জাদু করেছে মানেই নিশ্চিতভাবে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে”—এ ধরনের সরলীকৃত বক্তব্য পরিহার করা উচিত।
হারুত ও মারুত: কোরআনের বক্তব্য বনাম প্রচলিত কাহিনী
হারুত ও মারুতের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোরআনের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা করা।
কোরআন আমাদের জানায়—
১. সুলাইমান (আ.) জাদুকর ছিলেন না।
২. শয়তানরা মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত।
৩. ব্যাবিলনে হারুত ও মারুতের উল্লেখ রয়েছে।
৪. তারা মানুষকে সতর্ক করে বলত—“আমরা তো পরীক্ষা; অতএব তুমি কুফরি করো না।”
৫. মানুষ এমন জ্ঞান শিখেছিল যার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো হতো।
৬. আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা কারও ক্ষতি করতে পারত না।
এর বাইরে প্রচলিত বিভিন্ন কাহিনীর ক্ষেত্রে উৎস ও নির্ভরযোগ্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এটাই একজন সচেতন পাঠকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
আজকের সমাজের জন্য শিক্ষা
হারুত ও মারুতের ঘটনা শুধু প্রাচীন একটি ঘটনা নয়; এর মধ্যে বর্তমান সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, তথ্য ও জ্ঞানের অসাধারণ ক্ষমতা অর্জন করেছে। কিন্তু জ্ঞান অর্জন করলেই মানুষ নৈতিক হয়ে যায় না।
একটি জ্ঞান কল্যাণের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, আবার একই জ্ঞান মানুষের ক্ষতির কারণও হতে পারে।
হারুত ও মারুতের প্রসঙ্গে “আমরা তো কেবল পরীক্ষা”—এই সতর্কবার্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত।
মানুষকে তাই শুধু জানতে হবে না; জানতে হবে কোন জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করা উচিত।
আমাদের করণীয়
হারুত ও মারুতের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করার সময় কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—
প্রথমত: কোরআনের বক্তব্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত: সহিহ হাদিস ও নির্ভরযোগ্য তাফসির থেকে তথ্য যাচাই করতে হবে।
তৃতীয়ত: লোককাহিনীকে কোরআনের বক্তব্য হিসেবে প্রচার করা যাবে না।
চতুর্থত: নবী-রাসুল ও ফেরেশতাদের সম্পর্কে যাচাইহীন গল্প প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে।
পঞ্চমত: জাদু বা অদৃশ্য বিষয় নিয়ে অতিরঞ্জিত ভয় তৈরি না করে ইসলামের সঠিক আকিদা ও আমলকে গুরুত্ব দিতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর
হারুত ও মারুত কি কোরআনে উল্লেখিত?
হ্যাঁ। সূরা আল-বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে হারুত ও মারুতের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে।
হারুত ও মারুত কি ফেরেশতা ছিলেন?
কোরআনের অনুবাদে তাদের “দুই ফেরেশতা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে তাফসিরে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে।
হারুত ও মারুত কি মানুষকে জাদু শেখাতেন?
সূরা আল-বাকারা ১০২ অনুযায়ী তাদের সঙ্গে জাদু শেখানোর বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে। কিন্তু তারা সতর্ক করে দিতেন—“আমরা তো কেবল পরীক্ষা; অতএব তুমি কুফরি করো না।”
জোহরা ও শুক্রতারার গল্প কি কোরআনে আছে?
না। এই বিস্তারিত গল্প সূরা আল-বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে নেই। তাই এটিকে কোরআনের নিশ্চিত বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
জাদু কি ইসলামে নিষিদ্ধ?
হ্যাঁ। ইসলামী সূত্রে জাদুকে গুরুতর নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং সহিহ মুসলিমে এটিকে সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহের একটি বলা হয়েছে।
আল্লাহর অনুমতি ছাড়া জাদু কি ক্ষতি করতে পারে?
কোরআন স্পষ্টভাবে বলেছে, তারা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারও ক্ষতি করতে পারে না।
উপসংহার
হারুত ও মারুতের ঘটনা ইসলামী জ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু একই সঙ্গে সংবেদনশীল বিষয়।
এখানে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কোরআনের বক্তব্য এবং লোকমুখে প্রচলিত কাহিনীকে এক করে দেখা যাবে না।
সূরা আল-বাকারা ১০২ আমাদের জানায় যে সুলাইমান (আ.) জাদুকর ছিলেন না; বরং শয়তানরা মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত। ব্যাবিলনে হারুত ও মারুতের প্রসঙ্গও সেখানে এসেছে। তারা মানুষকে সতর্ক করে বলেছিল যে এটি একটি পরীক্ষা এবং মানুষ যেন অবিশ্বাসের পথে না যায়। একই সঙ্গে আল্লাহ জানিয়েছেন, তাঁর অনুমতি ছাড়া কোনো ক্ষতি সংঘটিত হতে পারে না।
অতএব হারুত ও মারুতের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করার সময় আবেগ, লোককাহিনী কিংবা চমকপ্রদ গল্পের পরিবর্তে কোরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য তাফসিরের আলোকে বিষয়টি বোঝাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
জ্ঞান মানুষের জন্য নিয়ামত, কিন্তু সেই জ্ঞান যখন পরীক্ষায় পরিণত হয় তখন মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়—সে কি সত্য ও কল্যাণের পথে থাকবে, নাকি সেই জ্ঞানকে অন্যায়ের কাজে ব্যবহার করবে?
হারুত ও মারুতের ঘটনায় এই নৈতিক শিক্ষাটিই আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র / রেফারেন্স
১. কোরআন — সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২:১০২
হারুত ও মারুত, জাদু এবং জাদুর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের প্রসঙ্গের প্রধান কোরআনিক উৎস।
Quran — Surah Al-Baqarah 2:102
২. তাফসির ইবনে কাসির — সূরা আল-বাকারা, ২:১০২
হারুত ও মারুত, জাদু এবং এই আয়াতের বিভিন্ন তাফসিরি ব্যাখ্যা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
Tafsir Ibn Kathir — Al-Baqarah 2:102
৩. সহিহ মুসলিম — হাদিস ৮৯: জাদু ও সাত ধ্বংসাত্মক গুনাহ
রাসুলুল্লাহ ﷺ জাদুকে সাতটি ধ্বংসাত্মক বড় গুনাহের একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
Sahih Muslim 89 — The Seven Destructive Sins
৪. সহিহ মুসলিম — হাদিস ২১৯২b: মু‘আউয়িযাতাইন পাঠ
আয়িশা (রা.)-এর বর্ণনায়, রাসুলুল্লাহ ﷺ অসুস্থ হলে মু‘আউয়িযাতাইন পাঠ করতেন এবং ফুঁ দিতেন।
Sahih Muslim 2192b — Al-Mu’awwidhat
৫. সহিহ মুসলিম — হাদিস ২১৮৯b: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর জাদুর ঘটনা
আয়িশা (রা.)-এর বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর জাদু করার ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
Sahih Muslim 2189b — Witchcraft
