LIVE
Politics

অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের ঘটনা আমাদের কী প্রশ্ন করে? মানুষের জীবন বাঁচানো চিকিৎসকের কাছেও চাঁদা?

Author: Published: Updated: 16/09/2026 Comments: 0 Estimated reading time: 11 min read Views: 30 views
অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের ঘটনা আমাদের কী প্রশ্ন করে? মানুষের জীবন বাঁচানো চিকিৎসকের কাছেও চাঁদা?

অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের ঘটনা বিনা পারিশ্রমিকে ২,০০০ কিডনি প্রতিস্থাপন, রোগীর পাশে বছরের পর বছর—তারপরও চাঁদার অভিযোগ। বাংলাদেশের গল্প অনেক বৈপরীত্যে ভরা। এই দেশে একই সঙ্গে এমন মানুষ আছেন, যারা নিজেদের সামর্থ্য দিয়ে অন্যের জীবন বদলে দেন; আবার এমন ঘটনাও সামনে আসে, যেখানে মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে নিয়োজিত একটি হাসপাতালকেও নানা ধরনের চাপ, হুমকি কিংবা অর্থ দাবির অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়।

অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের ঘটনা সেই বৈপরীত্যকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

একদিকে একজন চিকিৎসক, যিনি কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো জটিল চিকিৎসাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য দীর্ঘদিন কাজ করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে ২০২৬ সালের এপ্রিলে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি বা CKD হাসপাতালে চাঁদা দাবির অভিযোগে মামলা, গ্রেপ্তার, রিমান্ড এবং কারাগারে পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে।

এই দুটি বাস্তবতা পাশাপাশি রাখলে প্রশ্ন জাগে—মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য যিনি নিজের পেশাগত পারিশ্রমিক পর্যন্ত ত্যাগ করেছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানকেও যদি নিরাপত্তাহীনতা ও চাঁদার অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার অবস্থা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

ডা. কামরুল ইসলাম: চিকিৎসাকে শুধু পেশা হিসেবে দেখেননি

অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম বাংলাদেশের কিডনি প্রতিস্থাপন চিকিৎসার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত একজন চিকিৎসক। ঢাকার শ্যামলীতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল স্বল্প ব্যয়ে কিডনি চিকিৎসা ও প্রতিস্থাপনের জন্য পরিচিতি পেয়েছে।

২০২১ সালে ঢাকা পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডা. কামরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, কিডনি প্রতিস্থাপনের সময় তিনি নিজে রোগী ও কিডনিদাতার অস্ত্রোপচারে অংশ নেন এবং এর জন্য কোনো সার্জন ফি নেন না। সে সময় হাসপাতালের প্যাকেজ ছিল প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার টাকা, যার মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নির্দিষ্ট সময়ের ওষুধসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল। একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, প্রতিস্থাপন-পরবর্তী ফলোআপ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও রোগীদের বিনামূল্যে সেবা দেওয়া হয়।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।

“কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে” বললে অনেক সময় পাঠকের মনে হতে পারে পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ার কোনো খরচই নেই। বাস্তবে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, রোগী ও কিডনিদাতার চিকিৎসা, ওষুধ, পরীক্ষা, হাসপাতাল পরিচালনা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য একটি স্বল্পমূল্যের প্যাকেজ ছিল; তবে ডা. কামরুল ইসলাম নিজের সার্জন ফি নিতেন না। এই পার্থক্যটি তথ্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

২,০০০ কিডনি প্রতিস্থাপনের মাইলফলক

ডা. কামরুল ইসলামের কাজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো তাঁর নেতৃত্বে সম্পন্ন কিডনি প্রতিস্থাপনের সংখ্যা।

২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর তাঁর প্রতিষ্ঠিত CKD হাসপাতালে ২,০০০তম কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচারের জন্য কোনো সার্জন ফি গ্রহণ করেননি।

এর কয়েক বছর আগে, ২০২১ সালের প্রতিবেদনে তাঁর নেতৃত্বে এক হাজারের বেশি কিডনি প্রতিস্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, রোগীর ফলোআপ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

২০২৫ সালের ২,০০০তম প্রতিস্থাপনের মাইলফলক সেই দীর্ঘ সেবার পরিধিকেই সামনে নিয়ে আসে।

এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়।

একটি কিডনি প্রতিস্থাপনের পেছনে থাকে একজন রোগীর দীর্ঘ অসুস্থতা, একটি পরিবারের উদ্বেগ, একজন দাতার সিদ্ধান্ত, চিকিৎসক ও নার্সদের দীর্ঘ সময়ের শ্রম এবং একটি বড় ধরনের চিকিৎসা অবকাঠামো।

তাই ২,০০০টি সফল প্রতিস্থাপন মানে ২,০০০টি পরিবারের জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার গল্পও।

অর্থের চেয়ে সেবা—ডা. কামরুলের দর্শন

ডা. কামরুল ইসলামের পুরোনো সাক্ষাৎকারগুলোতে বারবার একটি বিষয় সামনে এসেছে—তিনি চিকিৎসাকে কেবল অর্থ উপার্জনের পেশা হিসেবে দেখেন না।

২০২১ সালে তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেছিলেন, “আমাদের সিকেডি হাসপাতাল একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। মানুষকে সেবা দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমাদের কাছে অর্থ নয়, সেবাই প্রথম।”

এমন দর্শনের পেছনে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক ইতিহাসের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

তিনি জানিয়েছেন, তাঁর বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন এবং সেই স্মৃতি তাঁকে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে। বিদেশে কাজের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দেশে থেকে চিকিৎসাসেবায় যুক্ত থাকার কথাও তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন।

মানুষের সেবাকে ইবাদত হিসেবে দেখার যে মানসিকতা তাঁর বক্তব্যে পাওয়া যায়, সেটিই তাঁর চিকিৎসা দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

চিকিৎসাসেবা শুধু অস্ত্রোপচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়

কিডনি প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন করাই চিকিৎসার শেষ ধাপ নয়।

প্রতিস্থাপনের পর রোগীকে নিয়মিত ওষুধ নিতে হয়, পরীক্ষা করতে হয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলোআপ করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় অনেক রোগীর জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ডা. কামরুল ইসলামের সঙ্গে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে জানা যায়, CKD হাসপাতালে প্রতিস্থাপন-পরবর্তী ফলোআপ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ক্ষেত্রে রোগীদের জন্য বিনামূল্যে সেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমনকি কিছু রোগী বছরের পর বছর সেখানে ফলোআপ করেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেছিলেন।

এ কারণে CKD হাসপাতালের মডেলটি শুধু কম খরচে অস্ত্রোপচারের বিষয় নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি রোগীসেবার একটি কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত।

তারপর এলো চাঁদা দাবির অভিযোগ

এতদিনের এই চিকিৎসাসেবার গল্পের মাঝেই ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সামনে আসে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ঘটনা।

ঢাকার শ্যামলীতে CKD হাসপাতালে চাঁদা দাবির অভিযোগে একটি মামলা করা হয়। মামলায় সাবেক যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিত মো. মঈন উদ্দিনকে প্রধান আসামি করা হয়। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের ইনচার্জ আবু হানিফ শেরেবাংলা নগর থানায় মামলাটি করেন।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল এবং টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভয়ভীতি ও হুমকির অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

এখানে আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—মামলায় কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। আইনের দৃষ্টিতে চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা উচিত।

তদন্ত ও গ্রেপ্তার

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সক্রিয় হয়।

১৩ এপ্রিল ২০২৬-এর প্রতিবেদনে জানা যায়, র‍্যাব মামলার প্রধান আসামি মঈন উদ্দিনসহ সাতজনকে আটক বা গ্রেপ্তারের কথা জানায়।

পরদিন আদালত প্রধান আসামিসহ তিনজনকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠান। এর আগে অন্য চার আসামিরও রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছিল।

পরবর্তীতে ১৭ এপ্রিল ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বাসস জানায়, মঈন উদ্দিনসহ সাতজনকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।

অর্থাৎ ঘটনাটি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি আনুষ্ঠানিক মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার পর্যায়েও গিয়েছে।

অভিযোগের পেছনে কী ছিল?

প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঘটনাটির পেছনে হাসপাতালের খাবার ও পণ্য সরবরাহকে কেন্দ্র করে বিরোধের কথাও এসেছে।

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালের খাবার সরবরাহকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল এবং হাসপাতালের পক্ষ থেকে মঈন উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের চাপ ও ভয়ভীতির অভিযোগ করা হয়েছিল।

অন্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও খাবার ও সরবরাহসংক্রান্ত বিষয়কে বিরোধের একটি প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এই অংশের অভিযোগগুলোও তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে দেখা প্রয়োজন। কোনো পক্ষের বক্তব্যকে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে সঠিক হবে না।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: একজন চিকিৎসক কি নিরাপদ?

এখানেই ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্নটি তৈরি হয়।

একজন চিকিৎসক যদি নিজের প্রতিষ্ঠানে রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য কাজ করেন, তাহলে তাঁর হাসপাতাল কি নিরাপদ পরিবেশ পাওয়ার অধিকার রাখে না?

একটি হাসপাতাল সাধারণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়।

সেখানে প্রতিদিন মানুষ আসে অসুস্থ শরীর নিয়ে। কেউ অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকে। কেউ আইসিইউতে থাকে। কেউ কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য প্রস্তুতি নেয়। কেউ তার প্রিয়জনকে বাঁচানোর আশায় হাসপাতালের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।

এমন একটি জায়গায় ভয়ভীতি, বিশৃঙ্খলা, জোরপূর্বক প্রবেশ কিংবা অর্থ দাবির অভিযোগ উঠলে তার প্রভাব শুধু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর পড়ে না। এর প্রভাব রোগী, রোগীর পরিবার, চিকিৎসক, নার্স এবং পুরো চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর পড়ে।

একটি হাসপাতালের নিরাপত্তা আসলে জনস্বাস্থ্যের অংশ।

চাঁদাবাজি শুধু অর্থের সমস্যা নয়

চাঁদাবাজিকে আমরা অনেক সময় কেবল টাকা দাবির ঘটনা হিসেবে দেখি।

কিন্তু এর সামাজিক প্রভাব আরও গভীর।

চাঁদা দেওয়ার চাপ তৈরি হলে একটি প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত অর্থের বোঝা বহন করতে হতে পারে। কোনো হাসপাতালের ক্ষেত্রে সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত রোগীর চিকিৎসা খরচে প্রভাব ফেলতে পারে।

আর যদি কোনো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান কম খরচে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করে, সেখানে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে সেই সেবামূলক কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অর্থাৎ একজনের কাছ থেকে অবৈধ অর্থ দাবি করা শেষ পর্যন্ত বহু মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

আরও বড় প্রশ্ন: অভিযোগ জানানোর পর ব্যবস্থা কত দ্রুত হওয়া উচিত?

এই ঘটনাটি আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।

যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হুমকি কিংবা চাঁদা দাবির অভিযোগ করে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং আইনসম্মত তদন্ত হওয়া কতটা জরুরি?

একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানুষের ন্যায়বিচারের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন থাকার কথা নয়।

কেউ আলোচিত ব্যক্তি হন কিংবা সম্পূর্ণ অখ্যাত নাগরিক—আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার একই হওয়া উচিত।

একজন বিখ্যাত চিকিৎসকের ঘটনা ভাইরাল হওয়ার কারণে যদি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে সেটি ইতিবাচক ফল হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন থাকবে—যে মানুষগুলো আলোচনার বাইরে থাকেন, তাঁদের অভিযোগের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা কি নিশ্চিত করা যায়?

এটাই আসল পরীক্ষা।

ভাইরাল না হলে কি বিচার মিলবে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আধুনিক সমাজে জনমত গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম।

একটি ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে কোনো অন্যায় বা অভিযোগ দ্রুত জনসমক্ষে আসতে পারে।

কিন্তু এখানেই একটি বিপজ্জনক প্রবণতার আশঙ্কা তৈরি হয়।

যদি মানুষ মনে করতে শুরু করেন যে কোনো অভিযোগকে গুরুত্ব পেতে হলে সেটিকে আগে ভাইরাল করতে হবে, তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা দুর্বল হতে পারে।

ন্যায়বিচারের ভিত্তি হওয়া উচিত প্রমাণ, আইন, তদন্ত এবং আদালতের প্রক্রিয়া—ভাইরাল হওয়ার ক্ষমতা নয়।

একজন সাধারণ নাগরিকের অভিযোগও যেন একটি প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব পায়—এটাই একটি কার্যকর রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

রাজনীতির পরিচয় কি কখনো আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে?

ঘটনাটিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আবার সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির সাংগঠনিক পরিচয় নিয়ে বক্তব্য এসেছে।

এই জায়গায় একটি নীতিগত প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকুন বা না থাকুন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।

রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে অপরাধী প্রমাণ করে না।

আবার রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বেও রাখে না।

এই ভারসাম্যটাই একটি গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

একজন চিকিৎসকের প্রতি সম্মান মানে শুধু তাঁকে প্রশংসা করা নয়

ডা. কামরুল ইসলামের ২,০০০ কিডনি প্রতিস্থাপনের মাইলফলক নিঃসন্দেহে চিকিৎসাসেবার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কিন্তু একজন চিকিৎসককে সম্মান করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রশংসা করা নয়।

বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা নিরাপদে কাজ করতে পারেন।

যেখানে হাসপাতালের কর্মীরা ভয় ছাড়া দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

যেখানে রোগী ও স্বজনেরা কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপ ছাড়াই চিকিৎসা নিতে পারেন।

যেখানে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বচ্ছ থাকবে।

যেখানে অভিযোগ থাকলে আইনগত প্রক্রিয়ায় তার সমাধান হবে।

এবং যেখানে কোনো ব্যক্তি নিজের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় ব্যবহার করে অন্যের ওপর বেআইনি প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন না।

চিকিৎসা খাতে এমন মানুষ আরও প্রয়োজন

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

কিডনি রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। ডায়ালাইসিস দীর্ঘমেয়াদি। কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজন দক্ষ সার্জন, উন্নত অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত নার্স, আধুনিক ল্যাব, আইসিইউ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ ব্যবস্থা।

এই বাস্তবতায় কেউ যদি নিজের পেশাগত দক্ষতা ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাকে তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য করার চেষ্টা করেন, সেটি সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

ডা. কামরুল ইসলামের কাজের মূল্যায়ন করতে হলে তাই শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, তিনি যে সেবামূলক চিকিৎসা কাঠামো গড়ে তুলেছেন সেটিকেও দেখতে হবে।

তবে একজন মানুষকে মহিমান্বিত করার চেয়েও বড় হলো প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা

এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।

কোনো একজন অসাধারণ চিকিৎসকের ওপর পুরো একটি সেবাব্যবস্থা নির্ভর করে থাকলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নয়।

প্রয়োজন এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে একজন চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকলেও রোগীরা নিরাপদ ও মানসম্মত সেবা পাবেন।

প্রয়োজন দক্ষ চিকিৎসক তৈরির ব্যবস্থা।

প্রয়োজন স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা।

প্রয়োজন নিরাপত্তা।

প্রয়োজন কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা।

প্রয়োজন পেশাজীবীদের সুরক্ষা।

এবং প্রয়োজন এমন একটি আইনি পরিবেশ, যেখানে কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা অবৈধ অর্থ দাবির অভিযোগ দ্রুত তদন্তের আওতায় আসে।

ডা. কামরুল ইসলামের গল্প তাই শুধু একজন চিকিৎসকের গল্প নয়

এটি আসলে বাংলাদেশের চিকিৎসা, মানবিকতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন—এই চারটি বিষয়ের গল্প।

একদিকে রয়েছে একজন চিকিৎসকের দীর্ঘ সেবাযাত্রা।

২০০৭ সাল থেকে কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি ধীরে ধীরে হাজার হাজার রোগীর চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁর ২,০০০তম কিডনি প্রতিস্থাপনের মাইলফলক সামনে আসে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর বিনা সার্জন ফি-তে এসব অস্ত্রোপচার করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের এপ্রিলে তাঁর হাসপাতালকে ঘিরে চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে, মামলা হয়, আসামিরা গ্রেপ্তার হন, আদালতে রিমান্ড হয় এবং পরবর্তীতে কারাগারে পাঠানোর আদেশ আসে।

দুটি ঘটনা একই সঙ্গে আমাদের একটি কঠিন সত্যের সামনে দাঁড় করায়।

একজন ভালো মানুষ থাকলেই একটি সমাজ ভালো হয়ে যায় না।

একজন মানবিক চিকিৎসক থাকলেই চিকিৎসাব্যবস্থা নিরাপদ হয়ে যায় না।

একজন সৎ পুলিশ কর্মকর্তা থাকলেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না।

প্রয়োজন এমন একটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা, যেখানে ভালো মানুষদের কাজ করার সুযোগ থাকবে এবং অপরাধের অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মতভাবে তদন্ত হবে।

আমাদের প্রত্যাশা

ডা. কামরুল ইসলামের মতো চিকিৎসকদের প্রতি সমাজের দায়িত্ব রয়েছে।

তাঁদের কাজকে সম্মান করা।

তাঁদের নিরাপদ পরিবেশ দেওয়া।

হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

রোগীদের অধিকার রক্ষা করা।

এবং একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি আবেগ দিয়ে নয়, আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা।

চাঁদাবাজি কারও ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়।

হাসপাতাল, স্কুল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক, চিকিৎসক, কৃষক, শ্রমিক কিংবা সাধারণ নাগরিক—কেউই বেআইনি অর্থ দাবি বা ভয়ভীতির শিকার হওয়া উচিত নয়।

কারণ একটি সমাজের সভ্যতার মাপকাঠি শুধু তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়।

সেই সমাজে দুর্বল মানুষ কতটা নিরাপদ, সেটিও তার বড় পরিচয়।

শেষ কথা: একজন চিকিৎসককে বাঁচানো মানে বহু রোগীর আশা বাঁচানো

অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের ২,০০০ কিডনি প্রতিস্থাপনের গল্প বাংলাদেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক অধ্যায়ের কথা বলে।

আর তাঁর হাসপাতালকে ঘিরে ২০২৬ সালের চাঁদা দাবির অভিযোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানবিক কাজের পাশাপাশি নিরাপদ সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশও প্রয়োজন।

আমরা যেন এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করতে পারি, যেখানে একজন চিকিৎসক রোগীর জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠান নিয়ে আতঙ্কে থাকবেন না।

যেখানে হাসপাতালের দরজা খুলবে চিকিৎসার জন্য, ভয় দেখানোর জন্য নয়।

যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় ক্ষমতার ঢাল হবে না।

যেখানে অভিযোগের গুরুত্ব নির্ধারণ করবে না সেটি কতবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার হয়েছে।

এবং যেখানে বিচার পাওয়ার জন্য কাউকে “ভাইরাল” হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে না।

ডা. কামরুল ইসলামের গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই—মানুষের সেবা করার মতো মানুষকে শুধু প্রশংসা করলেই হবে না; তাঁদের কাজ করার জন্য একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক এবং জবাবদিহিমূলক পরিবেশও তৈরি করতে হবে।

কারণ একজন চিকিৎসক যখন একজন মানুষের জীবন বাঁচান, তখন তিনি শুধু একজন রোগীকে বাঁচান না।

তিনি একটি পরিবারকে বাঁচান।

একটি ভবিষ্যৎকে বাঁচান।

কখনো কখনো একটি পুরো প্রজন্মের আশাকেও বাঁচিয়ে রাখেন।

আর সেই মানুষের কাজের জায়গাটি যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে প্রশ্নটি শুধু একজন ডাক্তারের নিরাপত্তা নিয়ে থাকে না।

প্রশ্নটি হয়ে যায়—আমরা আসলে কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছি?

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

  1. ঢাকা পোস্ট — ডা. কামরুল: বিনা পারিশ্রমিকে করেছেন এক হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন
    কিডনি প্রতিস্থাপনের খরচ, সার্জন ফি না নেওয়া, ফলোআপ সেবা এবং ডা. কামরুল ইসলামের চিকিৎসা দর্শন সম্পর্কে বিস্তারিত সাক্ষাৎকার।
    ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনটি দেখুন
  2. বাংলাদেশ টাইমস — পারিশ্রমিক ছাড়াই ২০০০ কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন ডা. কামরুল ইসলাম
    ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ২,০০০তম কিডনি প্রতিস্থাপনের মাইলফলক সম্পর্কে প্রতিবেদন।
    বাংলাদেশ টাইমসের প্রতিবেদনটি দেখুন
  3. যুগান্তর — দুই হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন করলেন ডা. কামরুল
    ২,০০০তম কিডনি প্রতিস্থাপন এবং বিনা পারিশ্রমিকে অস্ত্রোপচার করার বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন।
    যুগান্তরের প্রতিবেদনটি দেখুন
  4. The Business Standard — Dr Kamrul Islam: The people’s doctor
    CKD হাসপাতাল, স্বল্পমূল্যের কিডনি প্রতিস্থাপন, ফলোআপ সেবা এবং ডা. কামরুল ইসলামের চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন।
    The Business Standard-এর প্রতিবেদনটি দেখুন
  5. প্রথম আলো — কিডনি চিকিৎসক কামরুলের হাসপাতালে চাঁদা দাবি: প্রধান আসামি মঈনসহ তিনজন রিমান্ডে
    চাঁদা দাবির মামলায় প্রধান আসামিসহ তিনজনের রিমান্ডের তথ্য।
    প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি দেখুন
  6. BSS — সিকেডি হাসপাতালে চাঁদা দাবি: মঈনসহ ৭ জন কারাগারে
    রিমান্ড শেষে সাতজনকে কারাগারে পাঠানোর আদালতের আদেশ সম্পর্কে প্রতিবেদন।
    বাসসের প্রতিবেদনটি দেখুন
  7. বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর — কিডনি চিকিৎসক কামরুলের হাসপাতালে চাঁদাবাজির ঘটনায় মামলা
    মামলা দায়ের এবং ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ সম্পর্কে প্রাথমিক প্রতিবেদন।
    বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনটি দেখুন
  8. The Business Standard — ডা. কামরুলের হাসপাতালে চাঁদাবাজির ঘটনায় গ্রেপ্তার
    র‍্যাবের পক্ষ থেকে প্রধান আসামি মঈন উদ্দিনকে গ্রেপ্তারের তথ্য।
    The Business Standard-এর প্রতিবেদনটি দেখুন
👁 30 views

Mamunur RASHID

Mamunur RASHID is the editor and writer of July36 Chronicles, an independent digital publication covering Bangladesh, international affairs, history, society and current events. He focuses on presenting informative, contextual and responsibly sourced stories for Bengali-speaking readers.

Leave a Comment