একই জায়গায়, একই সময়ে, পাশাপাশি রাখা দুটো জিনিস।
একটি ছিল— সামান্য কিছু খাবার আর একটু পানীয়। অন্যটি ছিল একজন মানুষ— একটি জীবন্ত গাধা।
ঠিক একশো বছর পর… খাবারটি ছিল অবিকল তাজা, যেন এইমাত্র রাখা হয়েছে! আর গাধাটি? তার কিছু সাদা হাড় ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।

একই রোদ, একই বৃষ্টি, একই মাটি… তবুও একটি টিকে রইল, অন্যটি ধ্বংস হলো। কেন? কারণ মহান আল্লাহ দেখাতে চেয়েছিলেন— সংরক্ষণ এবং ধ্বংস, দুটোই কেবল তাঁরই হাতে।
আল্লাহ কেন বিশেষভাবে এই ঘটনাটিকে পবিত্র কুরআনে চিরস্থায়ী করে রাখলেন? এই একটিমাত্র ঘটনার মাঝে লুকিয়ে আছে মৃত্যু, সময়, পুনরুজ্জীবন এবং ঈমানের এমন সব রহস্য, যা শুনলে আপনার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে বদলে যেতে পারে।
এই রোমহর্ষক ঘটনায় প্রবেশের আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে সময়ের এক বিষাদময় অধ্যায়ে। আপনি যদি শুধু ‘একজন মানুষ একশো বছর ঘুমালেন’— এই অংশটুকু শোনেন, তবে এই ঘটনার প্রকৃত গভীরতা বুঝতে পারবেন না। কারণ, এই ঘটনার পেছনে আছে এক পুরো জাতির ধ্বংস, এক পবিত্র নগরীর পতন এবং বনি ইসরাইলের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়।
সময়টা তখন হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের যুগের পরের বহু শতাব্দী। বনি ইসরাইল তখনও আল্লাহর দেওয়া পবিত্র ভূমি— ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’-এর আশেপাশে বসবাস করছে। এই শহর ছিল তাদের হৃদয়। এই শহরেই ছিল হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের নির্মিত সেই মহান মসজিদ। এখানেই তাওরাতের বহু পবিত্র পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। এই শহরই ছিল তাদের ঐতিহ্য, তাদের পরিচয়, তাদের ঈমানের কেন্দ্রবিন্দু।

কিন্তু বনি ইসরাইল আবারও আল্লাহকে ভুলে যেতে শুরু করেছিল। তারা নবীদের কথা অগ্রাহ্য করেছিল, কেউ কেউ নবীদের হত্যা পর্যন্ত করেছিল! তাদের সমাজে সুদ, জিনা, মিথ্যা আর আল্লাহর বিধান বদলে ফেলার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা বারবার সতর্কবাণী পেয়েছিল, কিন্তু পাত্তা দেয়নি।;
অবশেষে এলো সেই ভয়ঙ্কর দিন। তাফসির ও ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, পূর্ব দিক থেকে ধেয়ে এলো এক প্রতাপশালী বাদশাহর বিশাল বাহিনী। সেই শাসকের নাম ইতিহাসে পরিচিত— ‘বুখতনাসর’ বা ‘নেবুচাদনেজার’।
তার সৈন্যবাহিনী ঘিরে ফেলল বায়তুল মুকাদ্দাস। শুরু হলো অবরোধ। দীর্ঘ অবরোধের পর একসময় শহরের দেয়াল ভেঙে পড়ল। কী হলো তারপর? তাফসিরের বর্ণনায় এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র— শহর পুড়িয়ে দেওয়া হলো, পবিত্র মসজিদ ধ্বংস করা হলো, তাওরাতের কপিগুলো আগুনে নিক্ষেপ করা হলো। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হলো, আর বাকিদের শেকল পরিয়ে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হলো ব্যাবিলনে— দাসত্বের অন্ধকারে।
একসময় সেই গৌরবময় নগরী পরিণত হলো এক ভুতুড়ে শ্মশানে। রাস্তায় পড়ে রইল মানুষের কঙ্কাল। বাড়িঘর হয়ে গেল ধ্বংসস্তূপ। ছাদগুলো দেয়ালের ওপর ভেঙে পড়ল। একসময় যে শহরে আজানের ধ্বনি শোনা যেত, সেই শহরে এখন শুধু বাতাসের শনশন শব্দ।
এবার আসুন, মূল ঘটনায় প্রবেশ করি। এই ধ্বংস হওয়া জনপদটির কথা বলেই পবিত্র কুরআন ঘটনাটি শুরু করেছে। আল্লাহ তাআলা সূরা আল-বাকারার ২৫৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন:
“অথবা সেই ব্যক্তির মতো, যে এক জনপদ অতিক্রম করছিল, যার ছাদগুলো দেয়ালের ওপর ভেঙে পড়েছিল।”
এই ব্যক্তিটি কে ছিলেন? পবিত্র কুরআন তার নাম উল্লেখ করেনি। কুরআন কেবল বলেছে— ‘একজন ব্যক্তি’। তবে তাফসিরে ইবনে কাসিরসহ অনেক মুফাসসিরের বর্ণনায় এসেছে, তিনি ছিলেন হযরত উজাইর আলাইহিস সালাম। কেউ কেউ অন্য নামও বলেছেন, কিন্তু একটি বিষয়ে সব মুফাসসির একমত— তিনি ছিলেন একজন সৎ, চিন্তাশীল এবং ঈমানদার ব্যক্তি।

কেন কুরআন তার নাম উল্লেখ করেনি? কারণ এই ঘটনার শিক্ষাটা তার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এই ঘটনা প্রতিটি ঈমানদারের জন্য, প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য।
এবার কল্পনা করুন সেই দৃশ্যটি। একজন সৎ ব্যক্তি একটি দীর্ঘ সফরে বেরিয়েছেন। তার বাহন একটি সাধারণ গাধা। তার সাথে ছিল কিছু সাধারণ খাবার। তাফসিরের বর্ণনায় এসেছে— কিছু রুটি, কিছু আঙুর বা শুকনো ফল এবং একটি চামড়ার পাত্রে পানীয়, সম্ভবত দুধ বা রস। মরুভূমির তপ্ত বাতাস বইছে, মাথার ওপর জ্বলন্ত সূর্য। চারদিকে ধূ ধূ বালু আর পাথর।
গাধার পিঠে দুলতে দুলতে তিনি এগিয়ে চলেছেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, আল্লাহ তার জন্য এমন একটি অভিজ্ঞতা রেখে দিয়েছেন, যা তার জীবন— বরং তার পরকাল পুরোপুরি বদলে দেবে।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে তিনি এসে পৌঁছালেন সেই জনপদে। কিন্তু একি কেমন জনপদ! তিনি তার গাধার লাগাম টেনে ধরলেন। থামলেন, চারদিকে তাকালেন। আর যা দেখলেন, তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ। ভাঙা দেয়ালের স্তূপ। ছাদগুলো ভেঙে পড়ে আছে দেয়ালের ওপর। একসময় যেখানে ছিল বাজার, সেখানে আজ শুধু পাথরের স্তূপ। যেখানে ছিল মানুষের ঘরবাড়ি, সেখানে আজ শুধু কঙ্কাল পড়ে আছে। রাস্তার পাশে, ঘরের ভেতরে, কূপের কাছে— সবখানে ছড়িয়ে আছে মানুষের হাড়।
সূর্য তখন ঝলমলে কিরণ ফেলছে, কিন্তু সেই আলোতে কোনো উষ্ণতা নেই। চারদিকে শুধু নিস্তব্ধতা… কোনো পাখির ডাক নেই, কোনো বাতাসের শব্দ নেই, কোনো মানুষের কথা নেই। শুধু মৃত্যু… আর মৃত্যুর নীরবতা।
সেই সৎ ব্যক্তি গাধার পিঠে বসে থেকেই এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখছিলেন। আর তখনই তার হৃদয়ে এক গভীর প্রশ্ন জেগে উঠল— “আল্লাহ কীভাবে এই মৃত্যুর পর এদের আবার জীবিত করবেন?”
এটি সন্দেহের প্রশ্ন ছিল না, কারণ তিনি ছিলেন একজন ঈমানদার। তিনি বিশ্বাস করতেন আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপ দেখে, এই কঙ্কালগুলো দেখে, তার মনে এক বিস্ময়কর কৌতূহল জাগলো। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করলেন—”এই হাড়গুলো এত পুরনো! এই মানুষগুলো কত আগে মারা গেছে? আল্লাহ কীভাবে এদের আবার জীবিত করবেন?”
একটু ভাবুন, আমাদের সবার মনেই এই প্রশ্ন কখনো না কখনো আসে, তাই না? কেয়ামতের দিন আল্লাহ কীভাবে এত মানুষকে একসাথে জীবিত করবেন? এটি কোনো অপরাধ নয়, বরং একজন চিন্তাশীল মানুষের স্বাভাবিক কৌতূহল। সেই সৎ ব্যক্তিরও এই একই কৌতূহল জাগলো। তিনি সন্দেহ করেননি, তিনি শুধু বিস্মিত হয়েছিলেন।
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তার এই কৌতূহলের এক চমৎকার উত্তর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এমন এক উত্তর, যা এই ব্যক্তি পৃথিবীর আর কারো থেকে পেতেন না। আল্লাহ এমন এক পাঠ্যপুস্তক খুলে দিলেন, যার পাতা হবে তিনি নিজে। ঠিক সেই মুহূর্তে মহান আল্লাহ তার প্রাণ কেড়ে নিলেন। পাশে পড়ে থাকলো তার খাবারের থলে, পানির পাত্র। আর কিছুক্ষণ পর তার গাধাটিও মারা গেল। সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝে এখন আরও একটি মৃতদেহ যোগ হলো—একজন মানুষ এবং তার বাহন। তার আত্মা আল্লাহর কাছে চলে গেল, আর তার দেহ পড়ে রইলো সেই মৃত শহরের মাঝে—নিঃসঙ্গ, পরিত্যক্ত, ভুলে যাওয়া।

এরপর শুরু হলো সময়ের এক অবিশ্বাস্য যাত্রা। মাস পেরিয়ে বছর, বছর পেরিয়ে দশক, দশক পেরিয়ে শতাব্দী—পুরো একশত বছর! একটু ভেবে দেখুন, ১০০ বছরে পৃথিবীতে কতকিছু বদলে যায়। যে শিশু সেই সময়ে মাত্র জন্মেছিল, সে বেড়ে উঠলো, বিয়ে করলো, সন্তানের বাবা হলো, তারপর দাদা হলো, তারপর নাতির কোলে মাথা রেখে মৃত্যুবরণ করলো। ১০০ বছরে তিন প্রজন্ম পার হয়ে যায়। বুখতানাসারের সাম্রাজ্য উত্থান-পতন দেখলো। তারপরে এলেন নতুন শাসকরা। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, এক সময় বনী ইসরাইলের বন্দী মানুষদের মুক্তি দেওয়া হলো। তারা ফিরে আসতে শুরু করলো তাদের হারানো ভূমিতে। বায়তুল মাকদিসের ধ্বংসস্তূপ ধীরে ধীরে সাফ করা হতে লাগলো। নতুন ঘরবাড়ি উঠতে লাগলো। মসজিদটি আবার পুনর্নির্মাণ শুরু হলো। মানুষের কণ্ঠে আবার ফিরে এলো জীবনের আওয়াজ।
কিন্তু, সেই এক নির্জন কোণে, যেখানে সেই সৎ ব্যক্তি পড়েছিলেন, সেখানে সময় যেন থমকে গিয়েছিল। কেউ তাকে খুঁজে পায়নি, কেউ তার লাশ দাফন করেনি। তার পরিবার হয়তো ভেবেছিল তিনি হারিয়ে গেছেন। তার সন্তানরা বেড়ে উঠেছে, তারপর মারা গেছে। তার নাতিরা এখন বৃদ্ধ। কিংবা হয়তো তার পরিবারের নামও কেউ এখন আর মনে রাখেনি। পৃথিবী এগিয়ে গেছে, কিন্তু তিনি পড়ে আছেন। আর তার গাধা? তার প্রিয় সেই বাহন? তার অবস্থা কী হলো?
তাফসির ও স্বাভাবিক প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী, মাংস কয়েকদিনেই পচে যায়। কয়েক সপ্তাহে চামড়া শুকিয়ে যায়। কয়েক মাসে সব বিলীন হয়ে যায়, শুধু হাড় থাকে। আর সেই হাড়ও বছরের পর বছর রোদ-বৃষ্টিতে ধূসর হয়ে যায়, কিছু হাড় ছড়িয়ে পড়ে এদিক-ওদিক। ১০০ বছর পর গাধাটির অবশিষ্ট বলতে শুধু কিছু সাদা হাড়, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপের মাঝে, চেনার কোনো উপায় নেই। কেউ দেখলে ভাববে, এ এক সাধারণ পশুর কঙ্কাল।
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় কী? সেই ব্যক্তির পাশে পড়ে থাকা তার খাবার—সেই রুটি, সেই ফল, সেই পানীয়—১০০ বছর পরেও পচেনি, শুকায়নি, নষ্ট হয়নি। ভেবে দেখুন, সাধারণ দুই দিনেই খাবার নষ্ট হয়ে যায়। রুটি ছত্রাক ধরে, ফল পচে যায়, দুধ বা পানীয় বিষাক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু মহান আল্লাহর কুদরতে সেই খাবার ১০০ বছর ধরে অবিকল সেরকমই ছিল, যেরকম সেই ব্যক্তি রেখেছিলেন। কেন এই পার্থক্য? একই জায়গায়, একই আবহাওয়ায়, একই সময়ে—একদিকে গাধা পচে হাড়ে পরিণত হলো, অন্যদিকে খাবার অবিকল তাজা রইলো। এর মাঝেই লুকিয়ে আছে আল্লাহর এক মহান শিক্ষা, যা আমরা কিছুক্ষণ পর দেখবো।
১০০ বছরের সেই দীর্ঘ সময় শেষ হলো। এবার এলো পুনরুজ্জীবনের সেই মুহূর্ত, যার জন্য গোটা মহাবিশ্ব যেন অপেক্ষা করছিল। মহান আল্লাহর হুকুমে সেই সৎ ব্যক্তির দেহে ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে এলো। তার আত্মা আবার তার শরীরে প্রবেশ করলো। তার হৃদয় আবার কাজ শুরু করলো। তার চোখের পাতা কাঁপলো এবং তিনি চোখ খুললেন। চারদিকে তাকালেন, সূর্যটা সামান্য সরে গেছে, ছায়াগুলো একটু দীর্ঘ হয়েছে। তিনি ভাবলেন, “আমি বোধহয় একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম—একদিন, বা হয়তো দিনের অর্ধেক?” তিনি উঠে বসলেন। কোনো অস্বাভাবিকতা টের পেলেন না। শরীরে কোনো ব্যথা নেই, কোনো ক্ষুধা নেই, কোনো ক্লান্তি নেই। সব যেন আগের মতোই।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রশ্ন এলো। তাফসিরে বর্ণনা অনুযায়ী, একজন ফেরেশতা বা অদৃশ্য ঐশী ঘোষণার মাধ্যমে জিজ্ঞেস করা হলো—”তুমি কতকাল এই অবস্থায় ছিলে?” সেই সৎ ব্যক্তি সরল মনে উত্তর দিলেন, “এক দিন অথবা এক দিনের কিছু অংশ।” তিনি নিজের অনুভূতির উপর নির্ভর করে উত্তর দিলেন। কারণ তার কাছে সত্যিই মনে হচ্ছিল, তিনি যেন সকালে শুয়েছিলেন এবং বিকেলে উঠেছেন।
তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এলো সেই বজ্রপাতের মতো ঘোষণা—”বরং তুমি ১০০ বছর এই অবস্থায় ছিলে!”
সেই ব্যক্তির মাথা ঘুরে গেল। কীভাবে সম্ভব? কিন্তু তিনি তো এখনো ক্ষুধার্ত নন, তার কাপড় তো এখনো অবিকল, তার শরীর তো এখনো তরুণ! এই বিস্ময় দীর্ঘায়িত হওয়ার আগেই আল্লাহ তাকে প্রমাণ দেখালেন
তিনটি স্পষ্ট প্রমানঃ
তিনটি চমৎকার, তিনটি অকাট্য প্রমাণ।
প্রথম প্রমাণ: আল্লাহ বললেন, “তুমি তোমার খাবার এবং পানির দিকে তাকাও। এক শতাব্দীতেও এতে পচন ধরেনি।” তিনি তার পাশে রাখা খাবারের থলের দিকে তাকালেন, রুটিটা তুলে নিলেন। অবিকল সেরকমই, যেরকম তিনি সকালে রেখেছিলেন—শুকায়নি, ছত্রাক ধরেনি। ফলগুলো দেখলেন, অবিকল তাজা; তাদের রং, তাদের সজীবতা কিছুই বদলায়নি। পানির পাত্রটি দেখলেন, সেই একই তরল, সেই একই স্বাদ। তিনি বুঝতে পারছিলেন না। অথচ আল্লাহ তাকে বুঝাতে চাইছেন—”দেখো, আমি যদি চাই সাধারণ জিনিসকেও আমি সময়ের প্রবাহ থেকে মুক্ত রাখতে পারি। যে খাবার দুই দিনে নষ্ট হওয়ার কথা, আমি তা ১০০ বছর অক্ষত রাখতে পারি। সময় আমার নিয়ন্ত্রণে, আমি সময়ের নিয়ন্ত্রণে নই।”
দ্বিতীয় প্রমাণ: আল্লাহ বললেন, “এবার তোমার গাধার দিকে তাকাও।” তিনি তার প্রিয় গাধাটির দিকে তাকালেন, কিন্তু সেখানে কোনো গাধা নেই; শুধু কিছু সাদা হাড় পড়ে আছে। গাধাটার আর কোনো চিহ্নই নেই। তার বুকটা কেঁপে উঠলো। তিনি এই গাধার পিঠে চড়ে এসেছিলেন কয়েক ঘণ্টা আগে, তার হিসাবে এটি জীবন্ত ছিল। এটি তার কথা বুঝতো, তার নির্দেশ পালন করতো। আর এখন—শুধু হাড়! এই মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারলেন, আল্লাহ তাকে দুটি বিপরীত দৃশ্য দেখাচ্ছেন। একদিকে খাবার—যা টিকে আছে; অন্যদিকে গাধা—যা ধ্বংস হয়েছে। এটি যেন একটি পাঠ্যপুস্তক—”দেখো, আমি চাইলে সংরক্ষণ করতে পারি, আমি চাইলে ধ্বংস করতে পারি; দুটোই আমার হাতে।”
এবার এলো তৃতীয় এবং চূড়ান্ত প্রমাণ: আল্লাহ বললেন, “এবার দেখো, আমি কীভাবে এই হাড়গুলোকে জীবিত করি।” সেই ব্যক্তি তাকিয়ে রইলেন। আর যা দেখলেন—ধ্বংসস্তূপের মাঝে পড়ে থাকা সেই হাড়গুলো ধীরে ধীরে নড়তে শুরু করলো, যেন কোনো অদৃশ্য হাত তাদের টেনে আনছে। এক জায়গায় আসতে শুরু করলো সেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়া হাড়গুলো। একে একে সঠিক জায়গায় বসতে লাগলো, ঠিক যেমন একটি জীবন্ত গাধার কঙ্কাল হওয়া উচিত। এরপর তাদের উপর তৈরি হতে লাগলো মাংস, শিরা-উপশিরা, রক্তনালী। মাংসের উপর এলো চামড়া, চামড়ায় উঠলো লোম এবং সবশেষে আল্লাহর হুকুমে সেই গাধার ভেতরে প্রাণ সঞ্চারিত হলো।
গাধাটি চোখ খুললো। একবার চারদিকে তাকালো, তারপর উঠে দাঁড়ালো, মাথা নাড়ালো। আর তার মালিকের দিকে তাকালো, যেন এইমাত্র ঘুম থেকে উঠে এসেছে। সেই সৎ ব্যক্তির চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো, তার পুরো শরীর কেঁপে উঠলো। তিনি এইমাত্র নিজের চোখে দেখলেন সেই অলৌকিক দৃশ্য, যা সম্পর্কে তিনি ১০০ বছর আগে প্রশ্ন করেছিলেন—”আল্লাহ এই মৃত জিনিসগুলোকে কীভাবে জীবিত করবেন?” আজ তিনি পেয়ে গেছেন তার উত্তর—কোনো তর্কের মাধ্যমে নয়, কোনো কিতাবের মাধ্যমে নয়, কোনো অন্যের বর্ণনায় নয়, নিজের চোখে। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন, “আমি জানি, নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বিষয়ের উপর সর্বশক্তিমান।” পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এই ব্যক্তির এই ঘোষণাকে চিরস্থায়ী করে রেখেছেন, যাতে আপনি, আমি এবং কেয়ামত পর্যন্ত সব মানুষ এই ঘোষণা থেকে শিক্ষা নিতে পারি।
সম্মানিত দর্শক, সূরা আল-বাকারার এই একটি ঘটনার মাঝে লুকিয়ে আছে আমাদের জীবনের জন্য পাঁচটি অমূল্য শিক্ষা। চলুন, সংক্ষেপে সেগুলো দেখে নেই।
প্রথম শিক্ষা: সময় আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে, আমাদের নয়। আমরা ভাবি সময় একটি সরল রেখা, যা সামনে এগিয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ চাইলে এক মুহূর্তকে ১০০ বছর বানাতে পারেন, আবার ১০০ বছরকে এক মুহূর্ত মনে হতে পারে।
দ্বিতীয় শিক্ষা: পুনরুজ্জীবন কোনো কল্পনা নয়, এটি অকাট্য সত্য। যিনি একটি গাধাকে হাড় থেকে জীবিত করতে পারেন, তিনি অবশ্যই আমাদের মাটিতে মিশে যাওয়া হাড় থেকেও জীবিত করতে পারবেন। এই ঘটনা আমাদের জন্য একটি জীবন্ত প্রমাণ। কাফেররা যতই বলুক, আমরা মরে গেলে কীভাবে জীবিত হবো—আল্লাহর কাছে এটি কোনো কঠিন কাজ নয়।
তৃতীয় শিক্ষা: বিস্ময় আর সন্দেহের মাঝে পার্থক্য। সেই সৎ ব্যক্তি সন্দেহ করেননি, বিস্মিত হয়েছিলেন। একজন প্রকৃত ঈমানদারও বিস্মিত হতে পারেন আল্লাহর সৃষ্টির বিশালতা দেখে, তার ক্ষমতার গভীরতা দেখে, বিস্ময়ে কথা হারিয়ে ফেলতে পারেন; কিন্তু এটি সন্দেহ নয়। সন্দেহ হলো অবিশ্বাস থেকে আসা, আর বিস্ময় আসে গভীর বিশ্বাস থেকে।
চতুর্থ শিক্ষা: সংরক্ষণ ও ধ্বংস—উভয়ই আল্লাহর হাতে। একই জায়গায়, একই সময়ে একদিকে খাবার টিকে রইলো, অন্যদিকে গাধা ধ্বংস হলো। কেন? কারণ আল্লাহ দেখাতে চাইছিলেন, তিনি চাইলে বস্তুকে সময়ের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে পারেন, আবার চাইলে দ্রুত ধ্বংসও করতে পারেন। আমাদের সম্পদ, আমাদের ক্যারিয়ার, আমাদের স্বাস্থ্য—সবকিছু আল্লাহর হাতে। আজ যা আছে, কাল থাকতে পারে, নাও পারে।
পঞ্চম এবং সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা: আমাদের জীবনও ১০০ বছরের বেশি নয়, আর আমাদের কেউ কেউ তার অর্ধেকও পাবো না। যে সময় আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন, তা অনেকের জীবনে ৬০, ৭০ কিংবা ৮০ বছর। সেই সময়টুকু আমরা কীভাবে কাটাচ্ছি? দুনিয়ার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে, নাকি আল্লাহর পথে? গুনাহে ডুবে থেকে, নাকি তওবায় ফিরে? সেই সৎ ব্যক্তি ১০০ বছর ঘুমিয়েছিলেন, আর উঠে বলেছিলেন—”এক দিন।” কেয়ামতের দিন আমাদেরও একই অনুভূতি হবে। আমরা ভাববো—এই তো সেদিন জন্ম নিলাম! কিন্তু ততক্ষণে সুযোগ শেষ, কাজের সময় শেষ।
তাই আজ, এই মুহূর্তে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন—যদি আল্লাহ আজ রাতেই আপনার প্রাণ কেড়ে নেন, আর ১০০ বছর পর যদি আপনি ঘুম থেকে উঠে দেখেন আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফেরেশতা, আপনি কি প্রস্তুত?
আজকের এই গভীর ও শিক্ষণীয় পর্বটি আপনার কেমন লেগেছে, তা অবশ্যই কমেন্ট করে আমাদের জানাবেন। কোন শিক্ষাটি আপনার হৃদয়কে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে, সেটিও লিখুন।
