সমাদকীয়ঃ মামুনুর রশিদ
ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্যগুলোর একটি হলো—কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। হাজার বছরের মানবসভ্যতার দিকে তাকালে দেখা যায়, যারা নিজেদের অপরাজেয় মনে করেছিল, যারা বিশ্বাস করেছিল তাদের সিংহাসন কখনো টলবে না, যারা মনে করেছিল রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন, অর্থসম্পদ এবং বাহিনীর শক্তি তাদের অনন্তকাল ধরে রক্ষা করবে, তাদের অনেকেই একদিন ইতিহাসের নির্মম বিচারের মুখোমুখি হয়েছে। সময়ের স্রোত যেমন থেমে থাকে না, তেমনি জনগণের ইচ্ছাকেও দীর্ঘদিন বন্দি করে রাখা যায় না। মানুষের কণ্ঠস্বরকে হয়তো সাময়িকভাবে স্তব্ধ করা যায়, কিন্তু চিরতরে মুছে ফেলা যায় না।
ক্ষমতার একটি স্বভাব আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে মানুষ অনেক সময় বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। চারপাশে প্রশংসাকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে, সমালোচকের সংখ্যা কমতে থাকে, আর সত্য বলার মানুষগুলো একে একে দূরে সরে যায়। তখন ক্ষমতাসীনরা একটি কৃত্রিম বাস্তবতার মধ্যে বাস করতে শুরু করে। তারা মনে করে জনগণ তাদের ভালোবাসে, অথচ বাস্তবে জনগণের হৃদয়ে ক্ষোভ জমতে থাকে। তারা মনে করে রাষ্ট্র মানেই সরকার, অথচ প্রকৃত সত্য হলো রাষ্ট্রের মালিক জনগণ; সরকার কেবল একটি সাময়িক দায়িত্ব।
যখন কোনো দেশে মানুষের আশা ভেঙে যেতে থাকে, যখন তরুণদের স্বপ্ন ক্ষয়ে যেতে থাকে, যখন সাধারণ মানুষের মনে এই অনুভূতি জন্ম নেয় যে তাদের কথা শোনা হচ্ছে না, তখন সমাজের ভেতরে নীরবে জমতে থাকে অসন্তোষ। এই অসন্তোষ একদিন হঠাৎ করে জন্ম নেয় না; এটি বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠে। একটি জাতির নীরবতা অনেক সময় সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। কারণ মানুষ যখন কথা বলা বন্ধ করে দেয়, তখন তারা ভাবতে শুরু করে। আর যখন তারা ভাবতে শুরু করে, তখন ইতিহাস নতুন মোড় নেওয়ার প্রস্তুতি নেয়।
পৃথিবীর প্রতিটি বড় গণআন্দোলনের পেছনে একটি সাধারণ সত্য কাজ করেছে—মানুষ তার মর্যাদা ফিরে পেতে চেয়েছে। কেউ রুটি চেয়েছে, কেউ ভোটাধিকার চেয়েছে, কেউ বাকস্বাধীনতা চেয়েছে, কেউ ন্যায়বিচার চেয়েছে। কিন্তু সব আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল মানুষের সম্মান এবং অধিকার। মানুষ যখন উপলব্ধি করে যে তার অস্তিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, তখন সে প্রতিবাদ করে। কখনো সেই প্রতিবাদ হয় শান্তিপূর্ণ, কখনো উত্তাল, কখনো দীর্ঘ, কখনো আকস্মিক। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে দেখা যায়, জনগণের শক্তিকে অবমূল্যায়ন করার পরিণতি কখনো শুভ হয়নি।
বিশ্ব ইতিহাসে রোমান সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের বিভিন্ন রাষ্ট্র পর্যন্ত অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ফ্রান্সের বিপ্লব, রাশিয়ার বিপ্লব, পূর্ব ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবর্তন, আরব বিশ্বের গণআন্দোলন—সবখানেই একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল: জনগণ যখন সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতার কাঠামোও কেঁপে ওঠে। কারণ অস্ত্রের শক্তি মানুষের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের বিবেককে নয়। ভয়ের শাসন কিছুদিন টিকে থাকতে পারে, কিন্তু অনন্তকাল নয়।
গণআন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মত্যাগ। ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে এমন কিছু মানুষ থাকেন যারা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে আদর্শকে বড় মনে করেন। তারা জানেন সামনে বিপদ আছে, তবুও এগিয়ে যান। তাদের সাহস অন্যদের সাহস জোগায়। একজনের কণ্ঠস্বর আরেকজনকে জাগিয়ে তোলে, তারপর সেই কণ্ঠস্বর লক্ষ মানুষের কণ্ঠে রূপ নেয়। একটি জাতির স্মৃতিতে এই আত্মত্যাগ কখনো হারিয়ে যায় না। সময় যতই পেরিয়ে যাক, মানুষ তাদের স্মরণ করে। কারণ তারা শুধু ব্যক্তি নন; তারা একটি সময়ের প্রতীক।
একজন মা যখন তার সন্তানকে হারান, তখন সেটি কেবল একটি পরিবারের বেদনা নয়; সেটি একটি জাতির বেদনা হয়ে ওঠে। একজন তরুণের অসমাপ্ত স্বপ্ন, একজন শিক্ষার্থীর অপূর্ণ ভবিষ্যৎ, একজন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষের অনুপস্থিতি—এসব কেবল পরিসংখ্যান নয়। ইতিহাসের বইয়ে হয়তো সংখ্যা লেখা থাকে, কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে থাকে একটি গল্প, একটি পরিবার, একটি কান্না, একটি শূন্যতা। তাই কোনো জাতির ইতিহাস বোঝার জন্য কেবল রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ জানলেই হয় না; মানুষের অনুভূতিও জানতে হয়।
ক্ষমতার পতনের মুহূর্তগুলো ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তখন স্পষ্ট হয়ে যায়, ক্ষমতার আসল ভিত্তি কোথায় ছিল। যারা গতকাল পর্যন্ত অপ্রতিরোধ্য মনে হতো, তারা হঠাৎ করেই দুর্বল হয়ে পড়ে। যারা মনে করেছিল তাদের চারপাশের মানুষ শেষ পর্যন্ত তাদের পাশে থাকবে, তারা অনেক সময় দেখতে পায় সেই সমর্থনের বড় অংশই ছিল ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ক্ষমতা চলে গেলে সেই সম্পর্কও হারিয়ে যায়। তখন মানুষ উপলব্ধি করে যে ভয় দিয়ে আনুগত্য আদায় করা যায়, কিন্তু শ্রদ্ধা আদায় করা যায় না।
রাজনীতির ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, জনগণের ভালোবাসা এবং জনগণের ভয়—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কোনো সরকার যদি ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সেই ভিত্তি দুর্বল। কারণ ভয় একদিন না একদিন ভেঙে যায়। কিন্তু যদি কোনো সরকার জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে, তাহলে সেই আস্থা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়। ইতিহাসে যেসব নেতাকে মানুষ মৃত্যুর পরও স্মরণ করে, তাদের অধিকাংশই জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। তারা ক্ষমতার কারণে মহান হননি; মানুষের সেবার কারণে মহান হয়েছিলেন।
ধর্মীয় শিক্ষাতেও একই বার্তা পাওয়া যায়। কুরআনের বিভিন্ন কাহিনিতে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে, অহংকার, জুলুম এবং অন্যায়ের পরিণতি শুভ হয় না। আদ, সামুদ, ফিরআউন—প্রতিটি কাহিনি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে পার্থিব শক্তি যত বড়ই হোক, নৈতিক পতন শুরু হলে সেই শক্তি টিকে থাকতে পারে না। এই শিক্ষা শুধু ধর্মীয় নয়; এটি ইতিহাসের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গেও মিলে যায়।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি। ন্যায়বিচার এবং প্রতিশোধ এক জিনিস নয়। একটি সভ্য সমাজের শক্তি হলো সে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ক্ষোভ থাকতে পারে, বেদনা থাকতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচার হতে হবে ন্যায়ের ভিত্তিতে। কারণ যদি অন্যায়ের জবাবে আরেকটি অন্যায় সৃষ্টি হয়, তাহলে সমাজ আবারও নতুন সংকটের দিকে এগিয়ে যায়। ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা হলো—ক্ষমতার অপব্যবহার যেন আর কখনো ফিরে না আসে।
আজকের পৃথিবীতে তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের চিন্তাভাবনাকে বদলে দিয়েছে। মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন। তারা রাজনৈতিক বক্তব্য শুনে, বিশ্লেষণ করে, তুলনা করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে কেবল প্রচারণা দিয়ে জনমত নিয়ন্ত্রণ করা আগের মতো সহজ নয়। জনগণ এখন জানতে চায়—কথা নয়, কাজ কী হয়েছে। প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবতা কী। এই পরিবর্তন আধুনিক গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার স্মৃতিশক্তির ওপর। যে জাতি তার ইতিহাস ভুলে যায়, সে জাতি বারবার একই ভুল করে। কিন্তু যে জাতি তার শহীদদের স্মরণ করে, অন্যায়ের ইতিহাস মনে রাখে এবং ন্যায়বিচারের দাবি ধরে রাখে, সে জাতি সামনে এগিয়ে যেতে পারে। ইতিহাসের স্মৃতি প্রতিশোধের জন্য নয়; শিক্ষা গ্রহণের জন্য।
সবশেষে বলা যায়, পৃথিবীর ইতিহাস আসলে ক্ষমতাবানদের নয়, জনগণের ইতিহাস। রাজা এসেছে, রাজা গেছে। সরকার এসেছে, সরকার গেছে। সাম্রাজ্য উঠেছে, সাম্রাজ্য ভেঙেছে। কিন্তু জনগণ রয়ে গেছে। তাদের শ্রমে সভ্যতা গড়ে উঠেছে, তাদের আত্মত্যাগে স্বাধীনতা এসেছে, তাদের সংগ্রামে পরিবর্তন এসেছে। তাই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জনগণ চিরস্থায়ী।
একদিন হয়তো আজকের সব রাজনৈতিক বিতর্ক ইতিহাসের পাতায় পরিণত হবে। আজকের নেতারা তখন কেবল ইতিহাসের চরিত্র হয়ে থাকবেন। কিন্তু মানুষ তখনও প্রশ্ন করবে—কে ন্যায়ের পক্ষে ছিল? কে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল? কে জনগণের কণ্ঠস্বর শুনেছিল? আর কে ক্ষমতার মোহে সত্যকে অস্বীকার করেছিল?
ইতিহাসের আদালত ধীর, কিন্তু তার বিচার অনিবার্য। সেখানে কোনো প্রচারণা কাজ করে না, কোনো পদমর্যাদা টিকে থাকে না, কোনো ক্ষমতার দম্ভ স্থায়ী হয় না। সেখানে টিকে থাকে কেবল সত্য, ন্যায় এবং মানুষের স্মৃতি। আর সেই স্মৃতির ভেতর দিয়েই একটি জাতি তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে।
