LIVE
রেমিটেন্স যোদ্ধা

রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের অধিকার ও মর্যাদা: রেমিট্যান্স চাইলে তাদের দাবিও পূরণ করতে হবে

Author: Published: Updated: 16/09/2026 Comments: 0 Estimated reading time: 10 min read Views: 22 views
রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের অধিকার ও মর্যাদা: রেমিট্যান্স চাইলে তাদের দাবিও পূরণ করতে হবে

রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের অধিকার : বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। দেশের লাখ লাখ পরিবার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন এবং দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই অর্থপ্রবাহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা শুধু পরিবারের জন্য অর্থ পাঠান না; তাঁদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বৈদেশিক লেনদেন, রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এই মানুষগুলোকে তাই শুধু ‘প্রবাসী’ বা ‘অভিবাসী শ্রমিক’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই। তাঁরা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। পরিবারের কাছ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে গিয়ে তাঁরা শ্রম দেন, নানা ধরনের ঝুঁকি নেন, অনেক সময় প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করেন এবং সেই উপার্জনের একটি অংশ দেশে পাঠান।

তাই রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সেবা নিশ্চিত করা শুধু অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয় নয়; এটি একটি কার্যকর ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও।

রেমিট্যান্স–যোদ্ধারা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

রেমিট্যান্সের গুরুত্ব বোঝার জন্য সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশে প্রায় ২.৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় ১৫.৪ শতাংশ বেশি।

এর আগে জুলাই ২০২৬-এর প্রথম ২৫ দিনেই রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ২.৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.৬ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে এ পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছিল।

এই প্রবাহের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের শ্রম, ত্যাগ এবং দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকার গল্প।

একজন প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো প্রতিটি ডলারের পেছনে রয়েছে কর্মঘণ্টা, শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ এবং অনেক সময় ব্যক্তিগত ঝুঁকি। তাই রেমিট্যান্সের পরিমাণ দিয়ে শুধু অর্থনীতির শক্তি পরিমাপ করলে এর মানবিক দিকটি আড়ালে থেকে যায়।

প্রশ্ন হওয়া উচিত—যে মানুষ দেশের অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখছেন, তাঁর নিজের অধিকার ও মর্যাদা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে?

অর্থ পাঠানো মানুষটির মর্যাদা কোথায়?

বিদেশে যাওয়ার আগে অনেক শ্রমিককে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নেন, কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করেন। এরপর বিদেশে গিয়ে বছরের পর বছর কাজ করে সেই ঋণ পরিশোধ করতে হয়।

অভিবাসন প্রক্রিয়ার উচ্চ ব্যয় ও নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম নিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ILO-এর ২০২৫ সালের বাংলাদেশসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়োগ ব্যয় এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সঙ্গে ন্যায্য নিয়োগব্যবস্থা ও শ্রমিকের ওপর অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয়ের চাপ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফলে একজন শ্রমিক বিদেশে পৌঁছানোর পর তাঁর প্রথম কয়েক বছর অনেক সময় ঋণ পরিশোধেই চলে যায়। এই পরিস্থিতিতে বিদেশে যাওয়ার ব্যয় কমানো শুধু শ্রমিকের আর্থিক স্বস্তির বিষয় নয়; এটি পরিবারের ওপর ঋণের চাপ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্সের স্থিতিশীল প্রবাহ নিশ্চিত করার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বিমানবন্দরে সম্মান—এটি বিলাসিতা নয়, অধিকার

প্রবাসীদের জন্য বিমানবন্দর দেশের সঙ্গে তাঁদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলোর একটি। বিদেশে যাওয়ার সময় সেখানে থাকে নতুন জীবনের স্বপ্ন; দেশে ফেরার সময় থাকে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পরিবারের কাছে ফিরে আসার আবেগ।

এই জায়গায় যদি কোনো প্রবাসী হয়রানি, অযথা বিলম্ব, অসৌজন্যমূলক আচরণ বা জটিলতার মুখোমুখি হন, তাহলে সেটি শুধু একজন ব্যক্তির দুর্ভোগ নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সেবার মানেরও প্রতিফলন।

প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কসহ বিভিন্ন সেবা কাঠামো রয়েছে। কিন্তু শুধু কাঠামো থাকলেই হবে না; সেবাটি কত দ্রুত, কার্যকর ও মানবিকভাবে দেওয়া হচ্ছে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রবাসীদের জন্য বিমানবন্দরে এমন একটি সমন্বিত সেবা ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে একজন শ্রমিক দেশে ফেরার পর অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ছাড়াই প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা পাবেন।

অভিবাসন ব্যয় কমানো এখন সময়ের দাবি

বিদেশে যাওয়ার আগে একজন শ্রমিক কত টাকা ব্যয় করবেন, সেটি যদি পরিষ্কার না থাকে, তাহলে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ তৈরি হয়।

কোন খাতে কত টাকা লাগবে—পাসপোর্ট, মেডিকেল পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ, ভিসা, বিমানভাড়া বা নিয়োগসংক্রান্ত অন্যান্য ব্যয়—এসব তথ্য আগেই প্রকাশ করা প্রয়োজন।

ILO-এর ন্যায্য নিয়োগসংক্রান্ত নীতিমালায় শ্রমিকের ওপর নিয়োগ ফি ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বোঝা না চাপানোর নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই নীতিকে বাস্তব প্রয়োগের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।

একজন শ্রমিক বিদেশ যাওয়ার আগে যেন অনলাইনে দেখতে পারেন, তাঁর গন্তব্য দেশের জন্য অনুমোদিত অভিবাসন ব্যয় কত, কোন খরচ বৈধ এবং কোন খরচ নেওয়া যাবে না।

এ ধরনের স্বচ্ছতা তৈরি করা গেলে প্রতারণা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ কমানো সম্ভব।

দালাল ও প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

প্রবাসী শ্রমিকদের অন্যতম বড় ঝুঁকি তৈরি হয় নিয়োগের পর্যায়েই।

ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতি, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুয়া ভিসা, চাকরির শর্ত পরিবর্তন, পাসপোর্ট আটকে রাখা কিংবা প্রতিশ্রুত বেতনের চেয়ে কম বেতন দেওয়ার মতো অভিযোগ অভিবাসন খাতে দীর্ঘদিনের সমস্যা।

এ কারণে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; নিয়োগব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।

বিদেশি চাকরির তথ্য সরকারি প্ল্যাটফর্মে যাচাই করা থাকা উচিত। চাকরির বেতন, কর্মঘণ্টা, নিয়োগকর্তা, আবাসন, চিকিৎসা সুবিধা এবং চুক্তির শর্ত শ্রমিক বিদেশ যাওয়ার আগেই জানতে পারবেন—এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে Recruitment Agents Information System বা RAIMS-এর মতো ডিজিটাল ব্যবস্থাও ব্যবহার করছে। ILO জানিয়েছে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর তথ্য ডিজিটালভাবে ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এখন প্রয়োজন এই ডিজিটাল ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, সহজবোধ্য এবং শ্রমিকবান্ধব করা।

পাসপোর্ট সেবা হতে হবে দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত

প্রবাসী শ্রমিকের জন্য পাসপোর্ট শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; এটি তাঁর কর্মসংস্থান, ভিসা ও বিদেশে বৈধ অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ নথি।

পাসপোর্ট নবায়নে অযথা বিলম্ব হলে একজন শ্রমিকের চাকরি বা বৈধ অবস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তাই প্রবাসীদের জন্য দ্রুত পাসপোর্ট সেবা, অনলাইন আবেদন, আবেদন ট্র্যাকিং এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

সরকারি সেবা যত বেশি ডিজিটাল ও সময়সীমাবদ্ধ হবে, তত বেশি কমবে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ।

দূতাবাসকে হতে হবে প্রবাসীর শেষ আশ্রয়

বিদেশে কোনো বাংলাদেশি শ্রমিক বিপদে পড়লে তাঁর প্রথম ভরসাগুলোর একটি হওয়া উচিত বাংলাদেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেট।

কিন্তু অনেক শ্রমিক ভাষাগত সমস্যা, আইনি জটিলতা, নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ, বেতন না পাওয়া কিংবা পাসপোর্টসংক্রান্ত সমস্যায় পড়লেও কোথায় এবং কীভাবে সহায়তা চাইবেন—তা জানেন না।

প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে বাংলাদেশি দূতাবাস বা কনস্যুলার সেবাকে আরও শ্রমিকবান্ধব করা প্রয়োজন।

জরুরি হটলাইন, আইনি সহায়তা, শ্রমিক অভিযোগ সেল, অনুবাদ সহায়তা এবং জরুরি আশ্রয়ের মতো ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যেতে পারে।

প্রবাসী যেন বিপদের সময় মনে করেন—রাষ্ট্রের দরজা তাঁর জন্য খোলা।

বিদেশে শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় দ্বিপাক্ষিক চুক্তি

বাংলাদেশের শ্রমিকরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। কিন্তু প্রতিটি দেশের শ্রম আইন, মজুরি কাঠামো ও কর্মপরিবেশ এক নয়।

তাই শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষার জন্য কার্যকর দ্বিপাক্ষিক শ্রমচুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ।

এসব চুক্তিতে ন্যূনতম বেতন, কর্মঘণ্টা, ওভারটাইম, আবাসন, চিকিৎসা, পাসপোর্টের নিরাপত্তা, চাকরি পরিবর্তনের সুযোগ, অভিযোগ নিষ্পত্তি, দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ এবং দেশে ফেরার ব্যবস্থা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

ILO-এর আন্তর্জাতিক শ্রমমানেও অভিবাসী শ্রমিকদের মর্যাদা, সমতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অতএব ভবিষ্যতের শ্রমবাজার কৌশলের লক্ষ্য শুধু বেশি মানুষকে বিদেশে পাঠানো হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপদ, দক্ষ ও ন্যায্য মজুরির কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।

‘প্রবাসী কার্ড’ যেন শুধু একটি পরিচয়পত্র না হয়

প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে। তবে এটি যেন কেবল আরেকটি কার্ড বা পরিচয়পত্রে সীমাবদ্ধ না থাকে।

একটি কার্যকর ডিজিটাল প্রবাসী সেবা প্ল্যাটফর্মে একজন প্রবাসী নিজের পাসপোর্টের অবস্থা, কর্মসংস্থান, বীমা, সরকারি সহায়তা, অভিযোগের অগ্রগতি, জরুরি যোগাযোগ এবং দেশে ফেরার প্রয়োজনীয় তথ্য এক জায়গা থেকে দেখতে পারলে উদ্যোগটি আরও কার্যকর হবে।

একটি ডিজিটাল প্রোফাইল যদি প্রবাসীর পুরো কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে সরকারও নীতিনির্ধারণে আরও নির্ভুল তথ্য ব্যবহার করতে পারবে।

রেমিট্যান্স পাঠানোকে আরও সহজ করতে হবে

প্রবাসী শ্রমিকদের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করতে হলে সেই ব্যবস্থাকে দ্রুত, সাশ্রয়ী ও সহজ করতে হবে।

একজন শ্রমিক কেন অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের দিকে ঝুঁকবেন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর খরচ, সময়, বিনিময় হার এবং প্রাপকের কাছে টাকা পৌঁছানোর সুবিধা বিশ্লেষণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য দেখায় যে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ শক্তিশালী রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসে মোট রেমিট্যান্স ছিল প্রায় ২.৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এই প্রবাহ আরও টেকসই করতে ব্যাংক ও বৈধ মানি ট্রান্সফার সেবার মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, লেনদেনের খরচ কমানো এবং ডিজিটাল সেবা সহজ করা প্রয়োজন।

রেমিট্যান্স–যোদ্ধাকে শুধু ‘টাকা পাঠান’ বললেই হবে না; টাকা পাঠানোর জন্য তাঁকে একটি সম্মানজনক, নিরাপদ ও সহজ ব্যবস্থা দিতে হবে।

প্রবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা

বছরের পর বছর বিদেশে শ্রম দেওয়ার পর একজন প্রবাসী দেশে ফিরে যদি চিকিৎসা বা সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অসহায় হয়ে পড়েন, তাহলে প্রবাসী কল্যাণনীতির একটি বড় ঘাটতি থেকেই যায়।

প্রবাসীদের জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা, বীমা, পুনর্বাসন এবং অবসরকালীন নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

বিশেষ করে দীর্ঘদিন বিদেশে কাজ করা শ্রমিকদের দেশে ফিরে দক্ষতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান বা উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।

কারণ একজন প্রবাসীর মূল্য শুধু তিনি কত টাকা দেশে পাঠিয়েছেন, তা দিয়ে নির্ধারণ করা উচিত নয়। তাঁর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশের জ্ঞানও দেশের সম্পদ।

মৃত প্রবাসীর মরদেহ দেশে ফেরানো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব

সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন একজন প্রবাসী শ্রমিক বিদেশের মাটিতে মারা যান।

একটি পরিবার তখন শুধু একজন মানুষকে হারায় না; অনেক সময় পরিবারের প্রধান আয়ের উৎসও হারিয়ে যায়।

মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া দ্রুত, মর্যাদাপূর্ণ এবং সহজ হওয়া প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যদের যেন এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ছুটতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটসংক্রান্ত সরকারি নথিপত্রে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জন্য পৃথক বাজেট কাঠামো রয়েছে।

এ ধরনের সরকারি বরাদ্দ ও কর্মসূচির কার্যকারিতা বিচার করতে হলে বাস্তবে কত পরিবার দ্রুত সহায়তা পেয়েছে, সেই তথ্যও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের ভুলে গেলে চলবে না

সব প্রবাসী সারাজীবন বিদেশে থাকেন না।

কেউ চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরেন, কেউ অসুস্থতার কারণে ফেরেন, কেউ বয়সের কারণে দেশে ফিরে আসেন, আবার কেউ প্রতারণা বা কর্মসংস্থানসংক্রান্ত সমস্যার কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরতে বাধ্য হন।

এই মানুষগুলোর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাংলাদেশের সম্পদ।

তাঁদের জন্য পুনর্বাসন ঋণ, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, দক্ষতার স্বীকৃতি, চাকরির সুযোগ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।

একজন প্রবাসী যেন দেশে ফিরে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে না করেন।

রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের ১০টি মৌলিক দাবি

১. বিমানবন্দরে প্রবাসীদের সঙ্গে সম্মানজনক ও হয়রানিমুক্ত আচরণ নিশ্চিত করা।

২. পাসপোর্ট নবায়নসহ সরকারি সেবা দ্রুত ও সময়সীমাবদ্ধ করা।

৩. বিদেশ যাওয়ার অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং সব বৈধ খরচ প্রকাশ্যে আনা।

৪. দালাল ও প্রতারক নিয়োগচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।

৫. বিদেশি চাকরির বেতন, নিয়োগকর্তা ও কর্মপরিবেশের তথ্য সরকারি প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা।

৬. দূতাবাসগুলোতে জরুরি সহায়তা, আইনি সেবা ও শ্রমিক অভিযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।

৭. শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর দ্বিপাক্ষিক শ্রমচুক্তি নিশ্চিত করা।

৮. বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোকে আরও দ্রুত, সস্তা ও সহজ করা।

৯. প্রবাসীদের স্বাস্থ্য, বীমা ও সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা সম্প্রসারণ করা।

১০. দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন, দক্ষতার স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

এখন দরকার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন

প্রবাসীদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার নানা উদ্যোগের কথা বলেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যেখানে সরকার পরিবর্তন হলেও প্রবাসী কল্যাণের মৌলিক নীতিগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হবে।

নীতির সাফল্য পরিমাপের জন্য স্পষ্ট সূচকও থাকা প্রয়োজন।

কতটা কমেছে অভিবাসন ব্যয়?

কতজন শ্রমিক প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন?

কতটি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে?

কতজন শ্রমিক আইনি সহায়তা পেয়েছেন?

পাসপোর্ট সেবা পেতে গড় সময় কত?

কতজন ফেরত আসা শ্রমিক পুনর্বাসিত হয়েছেন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়মিত প্রকাশ করা হলে প্রবাসী কল্যাণনীতি আরও জবাবদিহিমূলক হবে।

শুধু কত বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, সেই হিসাব নয়; কতজন মানুষ নিরাপদে কাজ করছেন এবং তাঁদের অধিকার কতটা নিশ্চিত হয়েছে—সেই হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।

রেমিট্যান্স শুধু ডলার নয়, মানুষের ঘাম

রেমিট্যান্সের হিসাব করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই শুধু ডলারের অঙ্ক দেখি।

কিন্তু প্রতিটি ডলারের পেছনে রয়েছে একজন মানুষের শ্রম।

কোনো মা তাঁর সন্তানকে বিদায় দিয়েছেন। কোনো স্ত্রী বছরের পর বছর স্বামীকে ছাড়া সংসার চালিয়েছেন। কোনো বাবা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য বিদেশে গেছেন। কোনো তরুণ নিজের জীবন বদলের স্বপ্ন নিয়ে অপরিচিত দেশে পাড়ি দিয়েছেন।

তাঁদের পাঠানো অর্থে পরিবারের ঘর তৈরি হয়েছে, সন্তানের পড়াশোনা হয়েছে, চিকিৎসা হয়েছে, ব্যবসা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিও পেয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যও দেখায়, রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২.৮৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল।

তাই রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের দাবি শুধু ‘সুবিধা পাওয়ার দাবি’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির মানবিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব দুটিই খাটো করা হয়।

তবে তাঁদের প্রতিটি দাবির বাস্তবায়নও অবশ্যই আইন, নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং স্বচ্ছতার কাঠামোর মধ্যে হতে হবে।

রাষ্ট্রের কাছে মূল প্রশ্ন

রাষ্ট্র যদি প্রবাসীদের শ্রম থেকে অর্থনৈতিক শক্তি পায়, তাহলে তাঁদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের রয়েছে।

একজন প্রবাসী যখন বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করেন, তখন তিনি শুধু নিজের পরিবারের প্রতিনিধি নন; তিনি দেশের শ্রমশক্তি, দক্ষতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতারও প্রতিনিধি।

তাঁর সঙ্গে অন্যায় হলে তার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে পড়ে না; বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ভাবমূর্তিতেও পড়ে।

তাই এখন প্রয়োজন একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি—প্রবাসীকে শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মানুষ হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখা।

রেমিট্যান্স চাইলে রেমিট্যান্স–যোদ্ধার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা রেমিট্যান্সের অঙ্ক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই অর্থনীতিতে অবদান রাখা মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতাও রাষ্ট্রের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের সম্মান করুন। তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করুন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।

কারণ তাঁরা দেশের বাইরে থাকলেও তাঁদের শ্রম, ঘাম, স্বপ্ন ও ভালোবাসার একটি বড় অংশ প্রতিদিন বাংলাদেশেই ফিরে আসে।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

১. বাংলাদেশ ব্যাংক — Wage Earner’s Remittance Monthly Data — মাসভিত্তিক রেমিট্যান্সের সরকারি পরিসংখ্যান।

২. বাংলাদেশ ব্যাংক — Workers’ Remittances Inflows — দেশভিত্তিক রেমিট্যান্স ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ের তথ্য।

৩. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) — জুলাইয়ের প্রথম ২৫ দিনে ২.৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স — বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন।

৪. International Labour Organization — Bangladesh migrant worker recruitment practices — বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়োগ ব্যয়, প্রতারণা ও ন্যায্য নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে বিশ্লেষণ।

৫. International Labour Organization — Fair Recruitment Principles and Guidelines — ন্যায্য নিয়োগ, নিয়োগ ব্যয় এবং শ্রমিক সুরক্ষার আন্তর্জাতিক নীতিমালা।

৬. International Labour Organization — Migrant Workers’ Rights Guide 2026 — অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা, সমতা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ সম্পর্কিত নির্দেশিকা।

৭. অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয় — ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বাজেট তথ্য — প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের সরকারি বাজেটসংক্রান্ত তথ্য।

👁 22 views

Mamunur RASHID

Mamunur RASHID is the editor and writer of July36 Chronicles, an independent digital publication covering Bangladesh, international affairs, history, society and current events. He focuses on presenting informative, contextual and responsibly sourced stories for Bengali-speaking readers.

Leave a Comment