LIVE
Bangladesh

সিন্ডিকেট ঘিরে উত্তপ্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নিয়োগের দাবিতে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ অবস্থান

Author: Published: Updated: 15/09/2026 Comments: 0 Estimated reading time: 9 min read Views: 31 views
সিন্ডিকেট ঘিরে উত্তপ্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নিয়োগের দাবিতে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ অবস্থান
Image

সিন্ডিকেট ঘিরে উত্তপ্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সিন্ডিকেট সভাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস পরিস্থিতি। ‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে চাকরির দাবিতে ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি।

৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ঘটনাকে ঘিরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন সদস্য সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ও বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। তাঁদের কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু ছিল সিন্ডিকেট সভা এবং সেখানে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নিয়োগের দাবি।

সিন্ডিকেট সভাকে ঘিরে উত্তেজনা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভাকে ঘিরে কয়েক দিন ধরেই ক্যাম্পাসে আলোচনা চলছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ফোরাম হওয়ায় এর বৈঠককে কেন্দ্র করে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে ‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’র সদস্যরা তাঁদের নিয়োগের দাবি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করতে চান। তাঁরা জানান, উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁরা উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে অবস্থান নেন।

ঘটনার একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের একটি দল অনুমতি ছাড়া উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশ করে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান সেখানে গিয়ে তাঁদের বের করে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এ সময় তিনি উপাচার্যের কক্ষে এভাবে প্রবেশের কারণ জানতে চান এবং প্রশাসনিক নিরাপত্তা ও দাপ্তরিক শৃঙ্খলার বিষয়টি তুলে ধরেন।

প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনকারীরা পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনের কার্যালয়েও যান। সেখানে নিয়োগ নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গ ওঠে। তবে উপ-উপাচার্যের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই সিন্ডিকেট সভার এজেন্ডায় তাঁদের নিয়োগসংক্রান্ত কোনো উদ্যোগ বা বিষয় ছিল না।

‘জুলাই যোদ্ধাদের’ নিয়োগের দাবি

‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’র আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে যারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া উচিত। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসন আগে এ বিষয়ে আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

আন্দোলনকারীদের বক্তব্য হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে মজুরিভিত্তিক বা অন্যান্য অস্থায়ী পদে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হলেও জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। ফলে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে—কোনো আন্দোলনে অংশগ্রহণের স্বীকৃতি কি সরাসরি সরকারি বা বিশ্ববিদ্যালয় চাকরির নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে? আবার অন্যদিকে, আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের প্রতি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে থাকলে সেটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—সেটিও প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ একটি সংবেদনশীল প্রশাসনিক বিষয়। এখানে একদিকে আন্দোলনকারীদের দাবি ও অবদানের স্বীকৃতির প্রশ্ন রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে নিয়োগের আইন, বিধিমালা, বিজ্ঞপ্তি, যোগ্যতা, প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন এবং সমান সুযোগের নীতি।

উপাচার্যের কার্যালয়ে অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন

আন্দোলনকারীরা বলছেন, তাঁরা উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের দাবির বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছিলেন। একাধিকবার চেষ্টা করেও সাক্ষাৎ না পাওয়ার পর তাঁরা উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে অবস্থান নেন।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃষ্টিতে বিষয়টি ভিন্ন। প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের বক্তব্য, জোর করে কোনো প্রশাসনিক কার্যালয়ে প্রবেশ করে চাকরি আদায়ের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, নিয়োগ হলে সেটি অবশ্যই নির্ধারিত নিয়ম ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হতে হবে।

প্রক্টরের এই বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে। কোনো গোষ্ঠী যদি নিজেদের দাবি আদায়ে প্রশাসনিক কার্যালয়ে প্রবেশ করে চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের নজির তৈরি হতে পারে। ফলে দাবি যৌক্তিক হলেও তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো ও নিয়মকানুনের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রশাসনিক কাঠামো, বিভিন্ন দপ্তর ও কর্মকর্তাদের তথ্য প্রকাশ করা হয়।

সাংবাদিককে ভিডিও মুছে ফেলার চাপের অভিযোগ

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাংবাদিকের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের আচরণ নিয়ে অভিযোগ।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন সাংবাদিক উপাচার্যের কার্যালয়ের পরিস্থিতির ভিডিও ধারণ করছিলেন। পরে কয়েকজন আন্দোলনকারী তাঁকে ঘিরে ধরে ধারণ করা ভিডিও মুছে ফেলার জন্য চাপ দেন বলে অভিযোগ ওঠে। সাংবাদিকের পরিচয় ও পরিচয়পত্রও পরীক্ষা করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কমিটির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমানের ব্যাখ্যা ছিল, আন্দোলনকারীদের অনেকে ওই সাংবাদিককে চিনতে পারেননি। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সেখানে সংবাদযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটেনি বলেই তাঁরা ভিডিওটি মুছে ফেলতে বলেছিলেন।

কিন্তু সংবাদ সংগ্রহ ও সাংবাদিকের কাজের স্বাধীনতার দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কোনো ঘটনাস্থলে সাংবাদিকের ভিডিও ধারণ করা বা সংবাদ সংগ্রহের অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলে তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় একটি জ্ঞান, মতপ্রকাশ ও মুক্তচিন্তার প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সেখানে সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তথ্য সংগ্রহ এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার সীমারেখা মেনে চলতে হয়। ফলে এমন পরিস্থিতিতে উত্তেজনা না বাড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।

নিয়োগ নিয়ে শিক্ষকদের পৃথক অভিযোগ

এর মধ্যেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে আলাদা বিতর্ক সামনে এসেছে। জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম, জিয়া পরিষদ ও ইউট্যাবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।

শিক্ষক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সিন্ডিকেট সভায় নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁরা দাবি করেছেন, নির্বাচনের আগে দ্রুততার সঙ্গে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া বড় ধরনের নিয়োগ দেওয়া হলে সেখানে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তাঁদের আরও অভিযোগ, এসব নিয়োগকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের আলোচনা রয়েছে। তবে এটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সংগঠনগুলোর অভিযোগ—প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার আগে যথাযথ তদন্ত ও প্রামাণ্য নথির প্রয়োজন রয়েছে।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনটি শিক্ষক সংগঠনের ইউজিসির কাছে অভিযোগ জানানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

নিয়োগে স্বচ্ছতা কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ শুধু চাকরি দেওয়ার একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক সক্ষমতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

নিয়োগ যদি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক হয়, তাহলে যোগ্য ব্যক্তিরা সুযোগ পান এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা বাড়ে। বিপরীতে নিয়োগ নিয়ে যদি রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সুপারিশ, আন্দোলনে অংশগ্রহণ বা অন্য কোনো বিশেষ পরিচয়কে যোগ্যতার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ কারণেই ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ কর্মসংস্থানের দাবির ক্ষেত্রেও একটি স্বচ্ছ নীতিমালা প্রয়োজন হতে পারে। যদি সত্যিই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের জন্য কোনো বিশেষ সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকে, তাহলে তার আইনি ভিত্তি, যোগ্যতার মানদণ্ড, যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং নিয়োগের কাঠামো প্রকাশ্যে আনা উচিত।

তাতে আন্দোলনকারীদের দাবিরও একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান তৈরি হবে, আবার অন্য চাকরিপ্রার্থীদের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন কমবে।

‘জুলাই চেতনা’ বনাম নিয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল বৈষম্যবিরোধী রাষ্ট্র ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা। সেই প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই চেতনা’ বাস্তবায়নের নামে যদি কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়, তাহলে সেটিও স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগততা ও যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া জরুরি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নিজেও জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ‘জুলাই ’২৪ স্মৃতি চত্বর’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। ওই অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, প্রক্টরসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অর্থাৎ জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি ও চেতনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরেও জায়গা পেয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো—এই চেতনাকে কীভাবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগনীতি, জবাবদিহি এবং বৈষম্যহীন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া হবে?

সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বচ্ছতা জরুরি

সিন্ডিকেট সভাকে ঘিরে এত আলোচনা তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো নিয়োগসংক্রান্ত নানা অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য। এ অবস্থায় সিন্ডিকেটে কী কী বিষয় আলোচিত বা অনুমোদিত হয়েছে, তা যথাসম্ভব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা জরুরি।

বিশেষ করে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কতটি পদ, কী ধরনের পদ, কী যোগ্যতা, কোন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ এবং কী বিধিমালার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে বিতর্ক অনেকটাই কমতে পারে।

একই সঙ্গে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটি তদন্তের সুযোগও থাকতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও প্রমাণের মাধ্যমে পরিষ্কার করতে হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতের বিভিন্ন প্রশাসনিক অনিয়ম, নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে অনুসন্ধানের বিষয়ও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনসহ নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানে গঠিত একটি কমিটির প্রতিবেদন দীর্ঘ সময়েও প্রকাশ না হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি দেখায়, শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করাই যথেষ্ট নয়; তদন্তের ফলাফলও যথাসময়ে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

প্রশাসনের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনে অন্তত দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

প্রথমত, যারা জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন বলে দাবি করছেন, তাঁদের যৌক্তিক দাবি কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হবে, সেটি স্পষ্ট করা।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের নিয়োগে আইন, বিধি, বিজ্ঞপ্তি ও যোগ্যতার মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা।

এই দুটি বিষয়কে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। বরং একটি স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে দুটিকে সমন্বয় করা সম্ভব। যদি কোনো বিশেষ শ্রেণির জন্য সুযোগ দেওয়ার রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থাকে, তবে সেটি সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা আগে নিশ্চিত করতে হবে।

ইউজিসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

শিক্ষক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ইউজিসির কাছে হস্তক্ষেপ চাওয়ার ঘটনাও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক নীতি, মান ও কাঠামোর ক্ষেত্রে ইউজিসির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট নিয়োগে ইউজিসির ভূমিকা কী হবে, সেটিও সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধির আলোকে নির্ধারিত হওয়া উচিত। অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি যাচাই করা, প্রয়োজন হলে ব্যাখ্যা চাওয়া এবং আইনসঙ্গত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা যেতে পারে।

অভিযোগ উঠেছে বলেই নিয়োগ অনিয়ম হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগকে উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়। স্বচ্ছ তদন্তই হতে পারে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ।

ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ জরুরি

বিশ্ববিদ্যালয় মূলত শিক্ষা, গবেষণা ও মুক্ত বিতর্কের জায়গা। নিয়োগ, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা আন্দোলনের মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে যদি প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, তাহলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী ও শিক্ষার পরিবেশের ওপর পড়ে।

তাই আন্দোলনকারীদের দাবি জানানোর অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও দাপ্তরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব রয়েছে। উভয় পক্ষের উচিত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা।

কোনো দাবি যৌক্তিক হলে সেটিকে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করার পথ তৈরি করতে হবে। আবার কোনো দাবি আইন বা বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে সেটিও পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

শেষ কথা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সিন্ডিকেট সভাকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি কেবল একটি নিয়োগের দাবি বা একটি দিনের আন্দোলন হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের স্বীকৃতি, কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগনীতি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ—সবকিছু।

‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দাবি যদি সত্যিই প্রশাসনের পূর্ববর্তী কোনো প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রতিশ্রুতির লিখিত ভিত্তি, আইনি কাঠামো ও বাস্তবায়নের পথ প্রকাশ করা দরকার। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তারও নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোনো আন্দোলনের চেতনা যেন অনিয়মের সুযোগ তৈরি না করে এবং নিয়োগের নিয়ম যেন মানুষের ন্যায্য দাবি উপেক্ষার অজুহাত না হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ হবে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হবে নিয়ম অনুযায়ী এবং যেকোনো অভিযোগের সমাধান হবে তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে—এটাই প্রত্যাশিত।

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা যদি হয়ে থাকে বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, তাহলে সেই নীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বাস্তব প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে দাবি, প্রতিশ্রুতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—তিনটির মধ্যেই থাকতে হবে স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগততা ও জবাবদিহি।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

১. The Daily Star — Group stages sit-in at RU, demands recruitment of ‘July movement participants’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর অবস্থান, ৬০–৭০ জনের অংশগ্রহণ, উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশ এবং নিয়োগ দাবির বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন। The Daily Star-এর প্রতিবেদনটি পড়ুন

২. NTV Online — রাবিতে অ্যাডহক ভিত্তিতে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের অভিযোগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে শিক্ষক সংগঠনগুলোর অভিযোগ এবং ইউজিসির হস্তক্ষেপ চাওয়ার বিষয়টি। NTV Online-এর প্রতিবেদনটি পড়ুন

৩. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় — অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, কর্মকর্তা, নোটিশ ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের সরকারি উৎস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট

৪. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় — জুলাই ’২৪ স্মৃতি চত্বরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগ সম্পর্কিত অফিসিয়াল তথ্য। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল প্রতিবেদন

৫. Views Bangladesh — RU inquiry committee yet to submit report after 16 months
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি ও জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গঠিত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে প্রতিবেদন। Views Bangladesh-এর প্রতিবেদনটি পড়ুন

৬. The Daily Campus — ১৬ মাসেও হলো না দুর্নীতি-নির্যাতনের বিরুদ্ধে গঠিত সত্যানুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ ও প্রশাসনিক অনিয়ম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিটির অগ্রগতি নিয়ে প্রতিবেদন। The Daily Campus-এর প্রতিবেদনটি পড়ুন

৭. The Daily Campus — রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান
অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের তথ্য। The Daily Campus-এর প্রতিবেদনটি পড়ুন

👁 31 views

Mamunur RASHID

Mamunur RASHID is the editor and writer of July36 Chronicles, an independent digital publication covering Bangladesh, international affairs, history, society and current events. He focuses on presenting informative, contextual and responsibly sourced stories for Bengali-speaking readers.

Leave a Comment