LIVE
July Archive

৩৬ জুলাই রক্তস্নাত গণঅভ্যুত্থান , ৫ আগস্টের বিজয় ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন

Author: Published: Updated: 17/10/2026 Comments: 1 Estimated reading time: 12 min read Views: 86 views
৩৬ জুলাই রক্তস্নাত গণঅভ্যুত্থান , ৫ আগস্টের বিজয় ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন

৩৬ জুলাই রক্তস্নাত গণঅভ্যুত্থান —বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক মাস, যার শেষ তারিখ যেন ক্যালেন্ডারে লেখা ছিল না; লেখা ছিল মানুষের রক্ত, অশ্রু, প্রতিবাদ ও প্রত্যয়ের ভেতর। একটি সাধারণ কোটা সংস্কারের দাবি থেকে যে আন্দোলনের সূচনা, তা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিণত হয় একটি বৃহত্তর গণআন্দোলনে। আর ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মোড় তৈরি করে।

পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের ছাত্রনেতা ও অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশ ৫ আগস্টকে প্রতীকীভাবে “৩৬ জুলাই” নামে অভিহিত করতে শুরু করেন। কারণ তাদের কাছে ৫ আগস্ট ছিল ক্যালেন্ডারের আগস্ট নয়—এটি ছিল জুলাইয়ের অসমাপ্ত সংগ্রামের শেষ দিন এবং একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনাক্ষণ।

“৩৬ জুলাই” তাই কোনো প্রচলিত তারিখ নয়; এটি একটি প্রতীকী রাজনৈতিক ও সামাজিক স্মৃতি। জুলাইয়ের রক্ত, ৫ আগস্টের বিজয় এবং একটি নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশাকে একই সুতোয় বেঁধে রাখার একটি নাম।

১. আন্দোলনের বীজ: একটি কোটা প্রশ্ন থেকে বৃহত্তর বৈষম্যবিরোধী চেতনা

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের তাৎক্ষণিক সূত্রপাত ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে বিরোধ থেকে।

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। ২০১৮ সালে সরকার একটি পরিপত্রের মাধ্যমে সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করেছিল। পরে আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বিষয়টি আবার নতুন করে সামনে আসে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করে—রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা ও সমান সুযোগের নীতি কতটা কার্যকর?

এই প্রশ্নটি শুধু চাকরির কোটা নিয়ে ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় বাংলাদেশের তরুণ সমাজের আরও গভীর কিছু উদ্বেগ—

  • শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট;
  • ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা;
  • রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত নিয়োগের আশঙ্কা;
  • রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার সংকট;
  • মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ;
  • এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষোভ।

ফলে আন্দোলনের চরিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে।

শুরুতে যে আন্দোলন ছিল কোটা সংস্কারের আন্দোলন, সেটি ধীরে ধীরে পরিণত হয় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে। আর শেষ পর্যন্ত সেটি রূপ নেয় সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে।

Reuters-এর সমসাময়িক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে রূপান্তরিত হয়।

২. ১৫ জুলাই: সংঘর্ষের বিস্ফোরণ

জুলাইয়ের প্রথম দুই সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছিল। কিন্তু ১৫ জুলাই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরকারসমর্থক ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে ওই দিনের হামলা ও পরবর্তী সহিংসতাকে আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ turning point হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এর পর আর আন্দোলনকে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হয়নি।

ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরে।

রাজপথে তখন একটি নতুন প্রশ্ন জন্ম নেয়—

“শুধু কোটা সংস্কার নয়, রাষ্ট্রের আচরণ কি বদলাবে?”

এই প্রশ্নই পরবর্তী দিনগুলোতে আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্রকে গভীর করে তোলে।

৩. ১৬ জুলাই: আবু সাঈদ—একটি ছবি, যা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের প্রতীক

১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গভীর প্রতীকী মুহূর্ত হয়ে ওঠে।

আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন। সামনে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তারপর গুলির শব্দ।

একজন তরুণ মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

সেই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যে এটি বাংলাদেশের প্রতিবাদের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রাথমিক বিশ্লেষণেও আবু সাঈদের মৃত্যুর ভিডিও বিশ্লেষণের কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, ভিডিওতে তাকে হাত প্রসারিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে এবং পরে গুলিবিদ্ধ হতে দেখা যায়।

আবু সাঈদ তখন আর শুধু একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর নাম থাকেননি।

তিনি হয়ে উঠেছিলেন—

একটি প্রজন্মের ক্ষোভের প্রতীক।

তার মৃত্যুর পর আন্দোলনের আবেগ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ রাজপথে আরও দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিতে শুরু করে।

৪. ইন্টারনেট shutdown: যখন একটি দেশ তথ্যের অন্ধকারে

আন্দোলনের সবচেয়ে উত্তাল পর্যায়ে সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল ডেটা পরিষেবা সীমিত ও বন্ধ করে দেয়।

ইন্টারনেট shutdown-এর ফলে দেশের ভেতরের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ভিডিও, ছবি, সংবাদ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ প্রকাশের পথও সংকুচিত হয়।

Human Rights Watch-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮ জুলাই দেশব্যাপী ইন্টারনেট shutdown কার্যকর হয় এবং এর ফলে সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও আন্দোলনকারীদের জন্য তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

কিন্তু প্রযুক্তির একটি অদ্ভুত বাস্তবতা আছে।

ইন্টারনেট বন্ধ করা যায়; মানুষের স্মৃতি বন্ধ করা যায় না।

একটি ভিডিও যদি হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সেটি মুছে ফেলা কঠিন।

একটি প্রত্যক্ষদর্শীর কথা যদি মানুষের মনে গেঁথে যায়, সেটিকে সহজে থামানো যায় না।

আর একটি মায়ের কান্না যদি একটি জাতির বিবেককে নাড়া দেয়, তখন কোনো blackout সেই কান্নাকে অদৃশ্য করতে পারে না।

৫. রক্তাক্ত জুলাই: রাজপথ যখন যুদ্ধক্ষেত্র

১৮ ও ১৯ জুলাই থেকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

ঢাকা, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারসমর্থক গোষ্ঠী ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সহিংসতা তীব্র হয়।

সরকার কারফিউ জারি করে এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

Human Rights Watch জানায়, নিরাপত্তা বাহিনী প্রাণঘাতী অস্ত্র, কাঁদানে গ্যাস, rubber bullets ও shotgun pellets ব্যবহার করেছে এবং শত শত মানুষ নিহত বা আহত হওয়ার তথ্য সামনে আসে।

পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও জানায়, নিহত ও আহতের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন ছিল এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সহিংসতায় বিপুলসংখ্যক মানুষ হতাহত হয়েছিল।

এই সময়ের প্রতিটি দিন যেন বাংলাদেশের সামাজিক স্মৃতিতে একটি করে ক্ষত তৈরি করছিল।

৬. আদালতের রায়: কোটা প্রশ্নের সমাধান, কিন্তু আন্দোলন থামল না

২১ জুলাই বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বড় অংশ বাতিল করে এবং ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের জন্য রাখার নির্দেশ দেয়।

আইনি দিক থেকে এটি ছিল আন্দোলনের মূল দাবির একটি বড় অংশের সমাধান।

কিন্তু তখন আন্দোলনের চরিত্র বদলে গেছে।

শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন দাবি আসে—

  • আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তি;
  • সহিংসতার তদন্ত;
  • নিহতদের বিচার;
  • ইন্টারনেট পুনরুদ্ধার;
  • ক্যাম্পাস খুলে দেওয়া;
  • এবং রাষ্ট্রের দমনমূলক আচরণের জবাবদিহি।

অর্থাৎ কোটা প্রশ্নের সমাধান আন্দোলনের রাজনৈতিক ক্ষোভকে আর থামাতে পারেনি।

কারণ তখন প্রশ্নটি আর শুধু চাকরি নিয়ে ছিল না।

প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল—

রাষ্ট্র তার নাগরিকের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবে?

৭. ৯ দফা থেকে ১ দফা: আন্দোলনের রাজনৈতিক রূপান্তর

আন্দোলনের দাবিগুলো ক্রমশ বিস্তৃত হয়।

একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা ৯ দফা দাবি সামনে আনেন। কিন্তু সহিংসতা, প্রাণহানি, গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে সংস্কারের দাবি ছাড়িয়ে সরকার পরিবর্তনের দাবি সামনে আসে।

৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে আন্দোলনকারীরা এক দফা দাবি—শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ—ঘোষণা করে।

এটি ছিল আন্দোলনের ইতিহাসে একটি निर्णায়ক পরিবর্তন।

এখন আর প্রশ্ন ছিল না—

“কোটা কত শতাংশ হবে?”

প্রশ্ন হয়ে গেল—

“সরকার থাকবে কি থাকবে না?”

৮. ৩৬ জুলাই: ৫ আগস্টের দিকে এগিয়ে যাওয়া

৫ আগস্ট ২০২৪।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন।

আন্দোলনকারীরা “লং মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচি নিয়ে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

কারফিউ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নানা বাধা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ ঢাকার দিকে আসতে থাকে।

শহরের বাতাসে তখন এক ধরনের অদ্ভুত উত্তেজনা।

কেউ জানত না কয়েক ঘণ্টা পরে কী হবে।

কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল—

রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর আগের অবস্থায় ফিরবে না।

শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং দেশত্যাগ করেন। Reuters-এর ৫ আগস্টের প্রতিবেদনে তার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় এবং তার প্রায় ১৫ বছরের শাসনের অবসানের কথা উল্লেখ করা হয়।

এই মুহূর্ত থেকেই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশ ৫ আগস্টকে “৩৬ জুলাই” নামে অভিহিত করতে শুরু করে।

৯. কেন “৩৬ জুলাই”?

ক্যালেন্ডারে জুলাই মাস ৩১ দিনের।

তাহলে ৩৬ জুলাই কীভাবে সম্ভব?

এটি গণিতের কোনো ভুল নয়।

এটি একটি প্রতীকী রাজনৈতিক ভাষা।

জুলাইয়ের যে আন্দোলন ১ জুলাই শুরু হয়েছিল, ৫ আগস্ট তার রাজনৈতিক পরিণতিতে পৌঁছায়। আন্দোলনকারীদের কাছে ৫ আগস্ট ছিল জুলাইয়ের সংগ্রামেরই ধারাবাহিকতা।

তাই—

৩৬ জুলাই মানে ৫ আগস্ট নয় শুধু; ৩৬ জুলাই মানে জুলাইয়ের অসমাপ্ত ইতিহাসের শেষ অধ্যায়।

এটি একটি তারিখের চেয়ে বেশি।

এটি একটি স্মৃতি।

একটি প্রজন্মের অভিজ্ঞতা।

একটি রাজনৈতিক প্রতীক।

১০. বিজয়ের পরও রক্তপাত থামেনি

তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সব সহিংসতা শেষ হয়ে যায়নি।

বরং সরকার পতনের পর বিভিন্ন স্থানে প্রতিশোধমূলক হামলা, পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর আক্রমণ, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগসহ নানা ঘটনা সামনে আসে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর উল্লেখ করেছে যে ৫ ও ৬ আগস্টের পরও হত্যাকাণ্ড ও প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনা ঘটে এবং এর মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষও নিহত হন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।

একটি সরকার পতন মানেই একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্ম নয়।

ক্ষমতার পরিবর্তন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

কিন্তু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার—

  • নিরপেক্ষ তদন্ত;
  • আইনের শাসন;
  • বিচার বিভাগের স্বাধীনতা;
  • মানবাধিকারের সুরক্ষা;
  • রাজনৈতিক সহনশীলতা;
  • এবং প্রতিশোধের রাজনীতির অবসান।

১১. জুলাই আন্দোলন কি শুধু ছাত্র আন্দোলন ছিল?

না।

শুরুতে এটি ছিল মূলত শিক্ষার্থীদের আন্দোলন।

কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

শিক্ষার্থী, শ্রমিক, চাকরিপ্রার্থী, অভিভাবক, পেশাজীবী এবং সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে একটি বৃহত্তর সামাজিক চরিত্র দেয়।

এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ একটি ছাত্র আন্দোলন তখনই গণআন্দোলনে পরিণত হয়, যখন সমাজের বৃহৎ অংশ সেই আন্দোলনের মধ্যে নিজের বঞ্চনা ও প্রত্যাশার প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়।

জুলাই আন্দোলনের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছিল।

১২. তরুণ প্রজন্মের উত্থান

২০২৪ সালের আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল Gen-Z বা তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ।

এই প্রজন্মকে অনেক সময় বলা হয় প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্ম।

তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়।

তারা Facebook, YouTube, TikTok, Messenger, X এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তথ্য ও মতামত বিনিময় করে।

কিন্তু জুলাই দেখিয়ে দিল—

ডিজিটাল প্রজন্ম প্রয়োজনে রাজপথেও নামতে পারে।

তারা শুধু প্রতিবাদ করেনি।

তারা নিজেদের ভাষায় রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করেছে।

গ্রাফিতি এঁকেছে।

স্লোগান দিয়েছে।

ভিডিও ধারণ করেছে।

তথ্য ছড়িয়েছে।

আন্দোলনের ন্যারেটিভ তৈরি করেছে।

এমনকি ইন্টারনেট shutdown-এর মধ্যেও বিকল্প যোগাযোগের পথ খুঁজেছে।

এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

১৩. গ্রাফিতি: দেয়াল যখন ইতিহাস লিখল

জুলাই আন্দোলনের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রাফিতি ও রাজনৈতিক শিল্প।

ঢাকার দেয়াল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এবং বিভিন্ন নগর এলাকার দেওয়াল হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ক্যানভাস।

শিল্পীরা রং ও তুলির মাধ্যমে এমন একটি রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করেন, যা প্রচলিত রাজনৈতিক পোস্টারের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

দেয়ালে লেখা প্রতিটি বাক্য যেন বলছিল—

রাষ্ট্র জনগণের।

ভয়কে জয় করতে হবে।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।

এভাবে আন্দোলন শুধু রাজপথে নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরেও নিজের ছাপ রেখে যায়।

১৪. “দ্বিতীয় স্বাধীনতা”—একটি রাজনৈতিক উপমা

আন্দোলনের পর “দ্বিতীয় স্বাধীনতা” শব্দবন্ধটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মৌলিক ঐতিহাসিক ঘটনা।

অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে একটি গণঅভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা।

তাই “দ্বিতীয় স্বাধীনতা”কে আক্ষরিক অর্থে ১৯৭১-এর পুনরাবৃত্তি হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক মুক্তি, নতুন রাষ্ট্রচিন্তা ও পরিবর্তনের একটি প্রতীকী ভাষা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।

এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।

কারণ ইতিহাসকে আবেগ দিয়ে স্মরণ করা যায়, কিন্তু ইতিহাসকে বিকৃত করা উচিত নয়।

১৫. জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা: ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়

জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি বাংলাদেশের রাজনীতিকে একটি গভীর শিক্ষা দিয়েছে—

কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়।

একটি সরকার যত শক্তিশালীই হোক, যদি জনগণের একটি বড় অংশের আস্থা হারায়, তাহলে সেই শক্তির ভিত দুর্বল হতে পারে।

সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক সংগঠন—সবই গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো জনগণের আস্থা।

এই আস্থা হারিয়ে গেলে রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তি দিয়ে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

১৬. নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন আসলে কী?

“নতুন বাংলাদেশ”—এই শব্দবন্ধটি ২০২৪-এর পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

কিন্তু নতুন বাংলাদেশ বলতে কী বোঝায়?

শুধু সরকার পরিবর্তন?

না।

একটি সত্যিকারের নতুন বাংলাদেশ মানে হতে পারে—

একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র

সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকবে।

একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা

বিচার হবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে।

একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন

সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তিত হবে না।

একটি মানবিক পুলিশ ব্যবস্থা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণের নিরাপত্তার জন্য কাজ করবে, জনগণের ভয়ের কারণ হবে না।

একটি প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা

বিরোধী মতকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখা হবে না।

একটি মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থা

তরুণদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিচয় বা পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভর করবে না।

একটি বৈষম্যহীন সমাজ

রাষ্ট্রের সুযোগ ও সম্পদ বণ্টনে নাগরিকের অধিকার সমান হবে।

১৭. জুলাইয়ের শহিদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা কী?

শুধু স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা যথেষ্ট নয়।

শুধু প্রতিবছর ফুল দেওয়াও যথেষ্ট নয়।

শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করাও যথেষ্ট নয়।

যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণ করা যেখানে—

অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য কাউকে প্রাণ দিতে হবে না।

যেখানে একজন শিক্ষার্থী চাকরির জন্য তার মেধার ওপর আস্থা রাখতে পারবে।

যেখানে একজন সাংবাদিক সত্য বলার জন্য ভয় পাবেন না।

যেখানে একজন নাগরিক পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাইতে পারবেন।

যেখানে বিচার পেতে রাজনৈতিক পরিচয় প্রয়োজন হবে না।

আর যেখানে ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করা রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে বিবেচিত হবে না।

১৮. তবে ইতিহাসের আরেকটি শিক্ষা—প্রতিশোধ নয়, বিচার

জুলাইয়ের রক্তের প্রতিশোধ যদি আবার নতুন রক্তপাত সৃষ্টি করে, তাহলে ইতিহাসের শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধ এক জিনিস নয়।

প্রতিশোধ ব্যক্তিগত ক্ষোভকে তৃপ্ত করতে পারে।

কিন্তু বিচার রাষ্ট্রকে সুস্থ করে।

তাই জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, বেআইনি বলপ্রয়োগ এবং অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত জরুরি।

একইভাবে আন্দোলনের সময় বা পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ, পুলিশ, রাজনৈতিক কর্মী কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও স্বাধীন তদন্ত, জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীদের প্রতিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

১৯. ইতিহাসের মালিক কে?

ইতিহাস কোনো একক রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়।

ইতিহাসের মালিক জনগণ।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাও তাই কোনো একক দল, সংগঠন বা ব্যক্তির একচ্ছত্র কৃতিত্ব হিসেবে দেখলে ঘটনাটির ব্যাপ্তি ছোট হয়ে যায়।

ছাত্ররা আন্দোলনের সূচনা করেছিল।

সাধারণ মানুষ তাকে বিস্তৃত করেছিল।

তরুণরা তার ভাষা তৈরি করেছিল।

আর অসংখ্য মানুষ নিজের জীবন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে ফেলে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল।

এই বহুমাত্রিক অংশগ্রহণই জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি।

২০. ৩৬ জুলাই—একটি তারিখ নয়, একটি স্মৃতি

৩৬ জুলাই ক্যালেন্ডারে নেই।

কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতিতে এটি আছে।

এটি আছে আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাতে।

এটি আছে রাজপথে পড়ে থাকা তরুণদের রক্তে।

এটি আছে মায়ের চোখের পানিতে।

এটি আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিতে।

এটি আছে ইন্টারনেট shutdown-এর অন্ধকারে একে অন্যকে খবর পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টায়।

এটি আছে লাখো মানুষের ঢাকামুখী পদযাত্রায়।

আর এটি আছে ৫ আগস্টের সেই মুহূর্তে, যখন দীর্ঘদিনের ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়েছিল।

২১. কিন্তু ৫ আগস্টই কি শেষ?

না।

বরং ৫ আগস্ট ছিল আরেকটি যাত্রার শুরু।

একটি সরকার পতন ঘটানো তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান রাজনৈতিক ঘটনা।

কিন্তু একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ অনেক কঠিন কাজ।

নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে শুধু ক্ষমতার চেয়ার বদলালেই হবে না।

বদলাতে হবে—

রাষ্ট্রের সংস্কৃতি, প্রশাসনের চরিত্র, রাজনীতির ভাষা, বিচারের কাঠামো, আইন প্রয়োগের পদ্ধতি, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা, নাগরিক অধিকার সম্পর্কে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি।

এই পরিবর্তনগুলো না হলে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক বিজয় কেবল একটি সরকারের পতনের ইতিহাস হয়ে থাকবে।আর যদি প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়, নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হয় এবং রাষ্ট্র জবাবদিহিমূলক হয়, তাহলে জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সত্যিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

শেষ কথা: রক্তের ঋণ একটি মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের

জুলাই ২০২৪ আমাদের একটি কঠিন সত্য শিখিয়েছে—

মানুষকে দীর্ঘদিন ভয় দেখিয়ে রাখা যায়, কিন্তু চিরদিন নয়।

ক্ষমতা মানুষকে নীরব করতে পারে। কিন্তু মানুষের স্বপ্নকে চিরদিন বন্দী করে রাখতে পারে না। কোটা সংস্কারের একটি দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বদলে দিয়েছিল। আবু সাঈদের মৃত্যু, অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ, ইন্টারনেট shutdown, কারফিউ, রক্তাক্ত রাজপথ এবং ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান—সব মি

তথ্যসূত্র/রেফারেন্স,

United Nations Human Rights Office (OHCHR) — ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন, হতাহতের ঘটনা, আবু সাঈদ, ইন্টারনেট shutdown এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কে প্রাথমিক বিশ্লেষণ।
OHCHR — Preliminary Analysis of Recent Protests and Unrest in BangladeshUnited Nations Human Rights — Fact-finding Report — আন্দোলনের গভীরতর কারণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, জবাবদিহি ও পরবর্তী সংস্কার নিয়ে জাতিসংঘের অনুসন্ধান।
UN Human Rights — Bangladesh 2025 Fact-finding ReportReuters — Bangladesh PM Sheikh Hasina resigns amid mass protests — ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগ এবং আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিণতি।
Reuters — Bangladesh PM Sheikh Hasina resigns amid mass protestsReuters — Bangladesh court scraps most job quotas — কোটা আন্দোলনের পটভূমি এবং ২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের কোটা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত।
Reuters — Bangladesh court scraps most job quotasHuman Rights Watch — Bangladesh: Security Forces Target Unarmed Students — নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহার, ইন্টারনেট shutdown, গ্রেপ্তার ও আন্দোলনের সহিংসতা সম্পর্কে প্রতিবেদন।
Human Rights Watch — Bangladesh: Security Forces Target Unarmed StudentsHuman Rights Watch — Bangladesh: Prime Minister Hasina Resigns amid Mass Protests — আন্দোলনের বিকাশ, সরকার পতন এবং পরবর্তী মানবাধিকার ও আইনের শাসনসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ।
Human Rights Watch — Hasina Resigns amid Mass ProtestsUN Special Procedures — Communication on Bangladesh protests — ১৫–১৬ জুলাইয়ের সহিংসতা, আবু সাঈদের মৃত্যু এবং ইন্টারনেট shutdown সম্পর্কিত নথি।
UN Human Rights — Communication on Bangladesh protests

👁 86 views

Mamunur RASHID

Mamunur RASHID is the editor and writer of July36 Chronicles, an independent digital publication covering Bangladesh, international affairs, history, society and current events. He focuses on presenting informative, contextual and responsibly sourced stories for Bengali-speaking readers.