LIVE
Islamic

সূরা আল-কামার ৫৪:৪৯–৫৫: তাকদির, আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও মুত্তাকিদের জান্নাত

Author: Published: Updated: 08/10/2026 Comments: 1 Estimated reading time: 9 min read Views: 54 views
সূরা আল-কামার ৫৪:৪৯–৫৫: তাকদির, আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও মুত্তাকিদের জান্নাত

সূরা আল-কামার (৫৪:৪৯–৫৫)-এর শেষ সাতটি আয়াত মানুষের জীবন, তাকদির, আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, অতীত জাতির পরিণতি, মানুষের কর্মের হিসাব এবং মুত্তাকিদের চূড়ান্ত পুরস্কার সম্পর্কে অত্যন্ত গভীর শিক্ষা দেয়। মাত্র সাতটি আয়াতের মধ্যে যেন মানুষের পুরো জীবনযাত্রার একটি সংক্ষিপ্ত মানচিত্র তুলে ধরা হয়েছে—সৃষ্টি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, আল্লাহর আদেশ কত দ্রুত কার্যকর হয়, অতীত থেকে কেন শিক্ষা নিতে হবে, আমাদের প্রতিটি কাজ কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং শেষ পর্যন্ত কারা সফল হবে।

৫৪:৪৯ আয়াতে আল্লাহ বলেন, সবকিছু তিনি নির্ধারিত পরিমাপ অনুযায়ী সৃষ্টি করেছেন। এরপর ৫৪:৫০-এ তাঁর আদেশের দ্রুততা ও ক্ষমতার কথা এসেছে। ৫৪:৫১-৫৩ আয়াতে অতীতের অবাধ্য জাতি এবং মানুষের কর্মের পূর্ণ হিসাবের কথা বলা হয়েছে। আর শেষ দুই আয়াতে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—যারা তাকওয়া অবলম্বন করবে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত এবং আল্লাহর কাছে সম্মানজনক অবস্থান।

সূরা আল-কামার

📖 আয়াত ৪৯: সবকিছু নির্ধারিত পরিমাপে

إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ

বাংলা অর্থ:
“নিশ্চয়ই আমরা প্রত্যেক বস্তু নির্ধারিত পরিমাপে সৃষ্টি করেছি।”

এই আয়াতটি তাকদির বা কদর সম্পর্কে কুরআনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। এখানে “বিকদার” বা بِقَدَرٍ শব্দের মধ্যে নির্ধারণ, পরিমাপ, সামঞ্জস্য ও নির্দিষ্ট ব্যবস্থা—এসব অর্থের দিক রয়েছে।

ইবনে কাসিরের তাফসিরে এই আয়াতকে এমন আয়াতগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে যেখানে আল্লাহর সৃষ্টি ও নির্ধারণের বিষয়টি একসঙ্গে এসেছে। অর্থাৎ আল্লাহ কোনো কিছু এলোমেলোভাবে সৃষ্টি করেননি; তাঁর জ্ঞান ও হিকমতের অধীনে সৃষ্টিজগতের প্রত্যেকটি বিষয় নির্ধারিত।

তাফসিরে মাওদুদীর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, পৃথিবীর কোনো কিছুই আকস্মিক ও উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি হয়নি। প্রতিটি বিষয়ের একটি নির্দিষ্ট সময়, আকৃতি, বিকাশ, স্থায়িত্ব এবং শেষ হওয়ার সময় রয়েছে। এমনকি পৃথিবীরও একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে।

তাহলে “কদর” বলতে কী বোঝায়?

সহজ ভাষায় বলা যায়, আল্লাহর জ্ঞান, নির্ধারণ ও হিকমতের বাইরে কোনো কিছু ঘটে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষকে দায়িত্বহীন বা ইচ্ছাশক্তিহীন করে দেওয়া হয়েছে।

মানুষকে আল্লাহ ইচ্ছা, বুদ্ধি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছেন। সে ভালো কাজ করতে পারে, আবার মন্দ কাজও বেছে নিতে পারে। তাই মানুষ তার কাজের জন্য জবাবদিহি করবে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রয়েছে:

তাকদিরের ওপর বিশ্বাস মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং চেষ্টা করার পর ফলাফল আল্লাহর হাতে—এ বিশ্বাস রাখা।

একজন কৃষক জমিতে বীজ বপন করে, পানি দেয়, আগাছা পরিষ্কার করে এবং ফসলের জন্য পরিশ্রম করে। কিন্তু বীজ থেকে অঙ্কুর বের হওয়া, বৃষ্টি হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত ফসল পাওয়া তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। সে নিজের দায়িত্ব পালন করে; ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করে।

এটাই একজন মুমিনের জীবনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—চেষ্টা আমার, ফল আল্লাহর হাতে।

⚡ আয়াত ৫০: আল্লাহর আদেশ চোখের পলকের মতো

وَمَا أَمْرُنَا إِلَّا وَاحِدَةٌ كَلَمْحٍ بِالْبَصَرِ

বাংলা অর্থ:
“আর আমাদের আদেশ তো একটিমাত্র কথা—চোখের পলকের মতো।”

মানুষ যখন কোনো কাজ করতে চায়, তখন তাকে পরিকল্পনা করতে হয়, উপকরণ সংগ্রহ করতে হয় এবং অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু আল্লাহর ক্ষমতা মানুষের ক্ষমতার মতো নয়।

আল্লাহ যখন কোনো বিষয় সংঘটিত করতে চান, তাঁর জন্য তা কঠিন নয়। ইবনে কাসিরের ব্যাখ্যায় এই আয়াত আল্লাহর ইচ্ছা ও আদেশের কার্যকারিতা বোঝায়—তিনি কোনো কিছুর জন্য বারবার আদেশ দেওয়ার মুখাপেক্ষী নন; তাঁর আদেশ কার্যকর হওয়ার জন্য মানুষের মতো দীর্ঘ প্রস্তুতি প্রয়োজন হয় না।

আয়াতটির একটি বড় শিক্ষা হলো—মানুষ যেন নিজের সীমাবদ্ধতা দেখে আল্লাহর ক্ষমতাকে বিচার না করে।

আজ যে সমস্যাকে আমরা অসম্ভব মনে করছি, আল্লাহর কাছে তা কোনো কঠিন বিষয় নয়।

কখনো একটি বন্ধ দরজা আমাদের কাছে চিরস্থায়ী মনে হয়। কখনো মনে হয় জীবনের পরিস্থিতি আর পরিবর্তন হবে না। কখনো মনে হয় কোনো আশা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু মুমিন জানে, আল্লাহর ক্ষমতা মানুষের ধারণার সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়।

তাই দোয়া করার সময় হতাশ হওয়া উচিত নয়।

🕊️ আয়াত ৫১: অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান

وَلَقَدْ أَهْلَكْنَا أَشْيَاعَكُمْ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ

বাংলা অর্থ:
“আর অবশ্যই আমরা তোমাদের মতো অনেক দলকে ধ্বংস করেছি; অতএব উপদেশ গ্রহণ করার কেউ আছে কি?”

এখানে “আশইয়া‘” বলতে পূর্ববর্তী অনুরূপ দল বা জাতিগুলোর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে নূহ (আ.), আদ, সামূদ, ফেরাউনসহ বহু জাতির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

কিন্তু কুরআন এসব ঘটনা শুধু ইতিহাস হিসেবে বলে না। উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়।

একটি জাতি শক্তিশালী হতে পারে, সম্পদশালী হতে পারে, প্রযুক্তিতে উন্নত হতে পারে, রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করতে পারে—কিন্তু অন্যায়, অহংকার ও সত্য প্রত্যাখ্যান করলে সেই শক্তি তাকে চিরস্থায়ী নিরাপত্তা দিতে পারে না।

তাই একজন বুদ্ধিমান মানুষ শুধু প্রশ্ন করে না, “কী ঘটেছিল?” বরং সে প্রশ্ন করে, “কেন ঘটেছিল এবং আমি কী শিক্ষা নেব?”

এই আয়াতের শেষের প্রশ্ন—“ফাহাল মিন মুদ্দাকির?”—অর্থাৎ “উপদেশ গ্রহণ করার কেউ আছে কি?”—মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়।

📝 আয়াত ৫২: মানুষের সব কাজ সংরক্ষিত

وَكُلُّ شَيْءٍ فَعَلُوهُ فِي الزُّبُرِ

বাংলা অর্থ:
“তারা যা কিছু করেছে, তা সবই লিপিবদ্ধ আছে।”

মানুষ অনেক সময় মনে করে তার কিছু কাজ কেউ দেখেনি।

অন্ধকার ঘরে করা কোনো কাজ, গোপনে বলা কোনো কথা, কারও অজান্তে করা কোনো অন্যায়—সবই যেন মানুষের চোখের আড়ালে চলে যায়।

কিন্তু কুরআন আমাদের শেখায়, মানুষের কাজ আল্লাহর কাছে অজানা নয়।

এই শিক্ষা একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে বদলে দিতে পারে।

যখন কেউ জানবে যে তার প্রতিটি কাজের হিসাব রয়েছে, তখন সে একা থাকলেও সতর্ক থাকবে।

কেউ না দেখলেও সে অন্যায় করবে না।

কারণ তার কাছে মানুষের চোখের চেয়ে আল্লাহর নজরদারি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

📖 আয়াত ৫৩: ছোট-বড় সবকিছুই লিপিবদ্ধ

وَكُلُّ صَغِيرٍ وَكَبِيرٍ مُسْتَطَرٌ

বাংলা অর্থ:
“আর ছোট-বড় সবই লিপিবদ্ধ আছে।”

এটি মানুষের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী আত্মশুদ্ধির শিক্ষা।

আমরা সাধারণত বড় কাজকে গুরুত্ব দিই। বড় দান, বড় সাফল্য, বড় অপরাধ—এসব আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু একটি ছোট ভালো কাজও আল্লাহর কাছে মূল্যহীন নয়; একইভাবে ছোট অন্যায়কেও অবহেলা করার সুযোগ নেই।

একটি সুন্দর কথা কাউকে আশ্বস্ত করতে পারে।

একটি কঠিন কথা কাউকে ভেঙে দিতে পারে।

একটি গোপন দান কারও জীবন বদলে দিতে পারে।

আবার একটি ছোট মিথ্যাও মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করতে পারে।

তাই মুমিনের জীবনে “এটা তো সামান্য ব্যাপার”—এই মানসিকতার জায়গা থাকা উচিত নয়।

🌿 আয়াত ৫৪: মুত্তাকিদের জন্য জান্নাত

إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَنَهَرٍ

বাংলা অর্থ:
“নিশ্চয়ই মুত্তাকিরা থাকবে জান্নাতসমূহ ও নদীর মাঝে।”

এখানে হঠাৎ দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়েছে।

আগের আয়াতগুলোতে সতর্কতা, হিসাব ও শাস্তির সম্ভাবনার কথা এসেছে। এখন আল্লাহ মুত্তাকিদের পুরস্কারের কথা ঘোষণা করছেন।

মুত্তাকি হলো এমন ব্যক্তি, যে আল্লাহকে ভয় ও ভালোবাসার সঙ্গে জীবন পরিচালনা করে এবং তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে।

তাকওয়া শুধু বাহ্যিক পোশাক বা পরিচয়ের বিষয় নয়। তাকওয়া মানুষের অন্তরের এমন একটি অবস্থা, যা তাকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে নিয়ে যায়।

একজন মুত্তাকি যখন ব্যবসা করে, তখন সততা বজায় রাখে।

চাকরি করলে দায়িত্বশীল থাকে।

পরিবারে ন্যায়বিচার করে।

কেউ তার ওপর জুলুম করলেও সে সীমা অতিক্রম করতে চায় না।

কারণ সে জানে—তার প্রতিটি কাজের হিসাব আছে।

ইবনে কাসির ৫৪:৫৪ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুত্তাকিদের অবস্থানকে অপরাধীদের বিপরীত পরিণতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। একদিকে অবাধ্যদের জন্য শাস্তি, অন্যদিকে তাকওয়াবানদের জন্য জান্নাত।

👑 আয়াত ৫৫: সবচেয়ে বড় সম্মান কোথায়?

فِي مَقْعَدِ صِدْقٍ عِندَ مَلِيكٍ مُقْتَدِرٍ

বাংলা অর্থ:
“প্রকৃত সম্মানের আসনে, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বাদশাহর নিকটে।”

এটি সূরা আল-কামারের শেষ আয়াত এবং অত্যন্ত সুন্দর সমাপ্তি।

আল্লাহ জান্নাতের কথা বলার পর শুধু বাগান ও নদীর কথা বলেননি। বরং আরও উচ্চতর একটি সম্মানের কথা বলেছেন—‘মাক‘আদি সিদক’, অর্থাৎ সত্য ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান।

ইবনে কাসিরের ব্যাখ্যায় এটি আল্লাহর সম্মান, সন্তুষ্টি, অনুগ্রহ ও দয়ার আবাস হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আর “মালিকিন মুকতাদির” অর্থ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মহান রাজাধিরাজ—আল্লাহ।

অর্থাৎ জান্নাতের নেয়ামত যতই মহান হোক, এর সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে বড় সম্মান হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ।

জালালাইনের ব্যাখ্যাতেও “মাক‘আদি সিদক”কে এমন সম্মানজনক অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যেখানে অনর্থক কথা ও পাপের পরিবেশ নেই এবং “মুকতাদির” দ্বারা এমন ক্ষমতাবান সত্তাকে বোঝানো হয়েছে যাঁকে কোনো কিছুই অক্ষম করতে পারে না।

🌱 আয়াতগুলোর আলোকে জীবনের একটি সহজ গল্প

ধরা যাক, একটি ছোট শহরে রাহিম নামে একজন সাধারণ ব্যবসায়ী বাস করত।

তার দোকান খুব বড় ছিল না। প্রতিদিন সকালে সে দোকান খুলত এবং সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরত।

একদিন তার বন্ধু করিম তাকে বলল,
“তুমি এত পরিশ্রম করেও সবকিছুর ফল নিজের হাতে পাও না। তাহলে এত চেষ্টা করার অর্থ কী?”

রাহিম হাসল।

সে বলল,
“আমার কাজ হলো চেষ্টা করা। কিন্তু ফলাফল আমার হাতে নয়।”

করিম বলল,
“তাহলে কি সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারিত?”

রাহিম বলল,
“আল্লাহ বলেছেন, তিনি সবকিছু নির্ধারিত পরিমাপে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আমরা বসে থাকব। আমাদের দায়িত্ব হলো সঠিক পথে চেষ্টা করা।”

কয়েক মাস পর করিমের ব্যবসায় বড় ক্ষতি হলো। সে ভেঙে পড়ল।

রাহিম তাকে বলল,
“আজ তুমি যা হারিয়েছ, তা হয়তো তোমার কাছে বিশাল। কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। আমাদের কাজ হলো হতাশ না হয়ে সঠিক চেষ্টা করা।”

করিম ধীরে ধীরে আবার ব্যবসা শুরু করল।

একদিন তার সামনে এমন একটি সুযোগ এল, যা সে কখনো কল্পনাও করেনি।

তখন রাহিম তাকে বলল,
“দেখলে? আমরা কখনো জানি না কোন দরজা কখন খুলবে।”

কিন্তু রাহিম তাকে আরেকটি বিষয়ও মনে করিয়ে দিল।

“শুধু দুনিয়ার সাফল্যই আসল সাফল্য নয়। আমাদের প্রতিটি কাজও লিখে রাখা হচ্ছে। আমরা মানুষের কাছ থেকে অনেক কিছু লুকাতে পারি, কিন্তু আল্লাহর কাছ থেকে কিছুই লুকাতে পারি না।”

করিম জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে আমাদের কী করা উচিত?”

রাহিম বলল,
“ছোট ভালো কাজকে ছোট মনে করো না। আর ছোট পাপকেও ছোট মনে করো না। কারণ কুরআন বলেছে—ছোট-বড় সবই লিপিবদ্ধ।”

এই কথাগুলো করিমের জীবনে পরিবর্তন আনল।

সে ব্যবসায় প্রতারণা বন্ধ করল, কর্মচারীদের ন্যায্য মজুরি দিতে শুরু করল, গোপনে দান করতে লাগল এবং নামাজ ও ইবাদতের প্রতি যত্নবান হলো।

একদিন সে রাহিমকে বলল,

“আমি এখন বুঝতে পারছি, জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু বেশি টাকা পাওয়া নয়। বরং এমন জীবন যাপন করা, যার হিসাব আল্লাহর সামনে দিতে ভয় না লাগে।”

রাহিম বলল,

“এটাই তো এই আয়াতগুলোর শিক্ষা—আল্লাহর নির্ধারণে বিশ্বাস করো, তাঁর ক্ষমতার ওপর ভরসা করো, অতীত থেকে শিক্ষা নাও, নিজের প্রতিটি কাজের হিসাব মনে রাখো এবং তাকওয়ার জীবন বেছে নাও।”

🌙 সূরা আল-কামার ৫৪:৪৯–৫৫ থেকে আমাদের জীবনের ১০টি শিক্ষা

১. পৃথিবী এলোমেলো নয়।
সৃষ্টিজগত আল্লাহর জ্ঞান, হিকমত ও নির্ধারিত ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত।

২. তাকদিরে বিশ্বাস ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কিন্তু তাকদিরের অজুহাতে দায়িত্ব ও চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া সঠিক নয়।

৩. আল্লাহর ক্ষমতার কোনো সীমা নেই।
মানুষের কাছে যা অসম্ভব মনে হয়, আল্লাহর কাছে তা কঠিন নয়।

৪. অতীতের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
শুধু ইতিহাস জানা যথেষ্ট নয়; ইতিহাসের শিক্ষা নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে হবে।

৫. গোপন কোনো কাজই প্রকৃত অর্থে গোপন নয়।
মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে কিছু নেই।

৬. ছোট ভালো কাজকে অবহেলা করা যাবে না।
একটি ভালো কথা, একটি সাহায্য, একটি দান—সবই মূল্যবান হতে পারে।

৭. ছোট পাপকেও হালকা মনে করা উচিত নয়।
কারণ ছোট-বড় সবই লিপিবদ্ধ হচ্ছে।

৮. তাকওয়া শুধু মুখের দাবি নয়।
তাকওয়া মানুষের আচরণ, লেনদেন, কথা, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনে প্রকাশ পায়।

৯. জান্নাত শুধু বস্তুগত আনন্দের নাম নয়।
সেখানে রয়েছে সম্মান, নিরাপত্তা, শান্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি।

১০. সবচেয়ে বড় সফলতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
৫৪:৫৫ আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মুত্তাকিদের চূড়ান্ত মর্যাদা হলো “মাক‘আদি সিদক”—সম্মানজনক অবস্থান, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহর নিকটে।

❤️ আমাদের জন্য শেষ বার্তা

সূরা আল-কামারের ৪৯ থেকে ৫৫ নম্বর আয়াত যেন মানুষের সামনে জীবনের একটি আয়না তুলে ধরে।

একদিকে আমরা দেখতে পাই—সবকিছু আল্লাহর নির্ধারিত পরিমাপের অধীনে।

অন্যদিকে দেখতে পাই—আল্লাহর আদেশ কার্যকর হতে কোনো বিলম্ব প্রয়োজন হয় না।

এরপর মানুষকে বলা হয়—অতীত থেকে শিক্ষা নাও।

তারপর সতর্ক করা হয়—তোমাদের প্রতিটি কাজ সংরক্ষিত হচ্ছে।

আর সবশেষে আশার দরজা খুলে দেওয়া হয়—যারা তাকওয়ার জীবন বেছে নেবে, তাদের জন্য জান্নাত এবং সম্মানজনক অবস্থান রয়েছে।

তাই জীবনে বিপদ এলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। সফলতা এলে অহংকারী হওয়া যাবে না। ভুল হলে তওবা করতে হবে। অন্যায় করার সুযোগ এলে মনে রাখতে হবে—মানুষ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন।

আমরা জানি না আগামীকাল কী হবে। কিন্তু আমরা জানি, আমাদের রব জানেন।

আমরা জানি না কোন দরজা কখন খুলবে। কিন্তু আমরা জানি, তাঁর ক্ষমতা সীমাহীন।

আমরা জানি না আমাদের কোন ছোট কাজটি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হয়ে উঠবে। তাই ভালো কাজকে কখনো ছোট মনে করা উচিত নয়।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—আমাদের জীবনের শেষ গন্তব্য যেন শুধু দুনিয়ার সাফল্য না হয়; বরং এমন একটি জীবন হোক যার শেষ পরিণতি হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত।

আল্লাহ আমাদের তাকদিরের ওপর ঈমান রাখার, সঠিক পথে চেষ্টা করার, অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার, ছোট-বড় সব কাজে আল্লাহকে ভয় করার এবং মুত্তাকিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তাওফিক দান করুন।

আমিন।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

১. আল-কুরআন — সূরা আল-কামার, আয়াত ৪৯–৫৫
Quran.com — সূরা আল-কামার ৫৪:৪৯–৫৫

২. তাফসির ইবনে কাসির — সূরা আল-কামার ৫৪:৪৯
তাকদির, আল্লাহর নির্ধারণ ও সৃষ্টির বিষয়ে ইবনে কাসিরের ব্যাখ্যা।
Tafsir Ibn Kathir — Al-Qamar 54:49

৩. তাফসির ইবনে কাসির — সূরা আল-কামার ৫৪:৫০
আল্লাহর আদেশের দ্রুততা ও তাঁর ইচ্ছার কার্যকারিতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা।
Tafsir Ibn Kathir — Al-Qamar 54:50

৪. তাফসির ইবনে কাসির — সূরা আল-কামার ৫৪:৫৪–৫৫
মুত্তাকিদের জান্নাত এবং “মাক‘আদি সিদক”-এর ব্যাখ্যা।
Tafsir Ibn Kathir — Al-Qamar 54:55

৫. তাফহীমুল কুরআন — সূরা আল-কামার ৫৪:৪৯
“বিকদার” বা নির্ধারিত পরিমাপের ধারণা এবং সৃষ্টিজগতের নির্দিষ্ট ব্যবস্থার ব্যাখ্যা।
Tafhim-ul-Quran — Al-Qamar 54:49

👁 54 views

Mamunur RASHID

Mamunur RASHID is the editor and writer of July36 Chronicles, an independent digital publication covering Bangladesh, international affairs, history, society and current events. He focuses on presenting informative, contextual and responsibly sourced stories for Bengali-speaking readers.