উপসাগরীয় উত্তেজনা এর নেপত্থে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কের কারণে ইরানের যুদ্ধসংক্রান্ত বক্তব্যে ইউএই ক্রমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে উঠে এসেছে। তেহরানের বক্তব্যে বিশেষ করে ইউএইর ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক অবকাঠামো, ইসরায়েলের সঙ্গে আবুধাবির নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে এই উত্তেজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ইরান ইউএইকে যে কারণে যুদ্ধের সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে দেখছে বলে দাবি করছে, আবুধাবি তার অনেকটাই অস্বীকার করে। ইউএইর সরকারি অবস্থান হলো, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে নিজেদের ভূখণ্ড, আকাশসীমা বা জলসীমা ব্যবহার করতে দেয়নি এবং তারা নিজেদের এই যুদ্ধে পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে না।
ফলে প্রশ্নটি শুধু ‘ইরান কেন ইউএইকে লক্ষ্য করছে’—এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় প্রশ্ন: ইউএই কি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে, নাকি আবুধাবি একই সঙ্গে পশ্চিমা নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব ও ইরানের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক—দুটিই ধরে রাখতে চাইছে?
ইরানের চোখে ইউএই কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক বক্তব্যে ইউএইর নাম নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব বেড়েছে।
আল জাজিরার একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর ইসরায়েল ও ইউএইর সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসও ইউএইতে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। যুদ্ধের সময় ইউএইতে ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব উন্নয়নকে কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয় না। তেহরান মনে করে, ইউএইর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা সহযোগিতা উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর সামরিক কাঠামো তৈরি করছে।
অন্যদিকে আবুধাবির বক্তব্য হলো, তাদের আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং এর অর্থ এই নয় যে ইউএই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনায় নিজের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইউএইর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে বলেছিল, তাদের আকাশসীমা, ভূখণ্ড বা জলসীমা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
এই দুই অবস্থানের মধ্যকার পার্থক্যই বর্তমান উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
আল-ধাফরা ও আল-মিনহাদ: ইরানের সামরিক হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ নাম
ইউএইর মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি তেহরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।
আল-ধাফরা বিমানঘাঁটি ও আল-মিনহাদসহ বিভিন্ন স্থাপনায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ইরানি সামরিক বাহিনী ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দাবি করেছে, তারা ইউএইর আল-ধাফরা ও আল-মিনহাদ ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন বাহিনী ও রাডার ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এ দাবির খবর আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি ও আনাদোলু এজেন্সিও প্রকাশ করেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ইরান যদি ইউএইর ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে, তাহলে তেহরানের সামরিক যুক্তিতে লক্ষ্য হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের অবকাঠামো; কিন্তু বাস্তবে হামলার ঝুঁকি বহন করতে হয় ইউএইকেও।
এই কারণেই আবুধাবির কাছে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ইউএইর জন্য সমস্যা হলো ‘মিত্রের ঘাঁটি’ বনাম ‘নিজের ভূখণ্ড’
ইউএই দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে।
কিন্তু ভূগোল ইউএইকে একটি ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।
ইরান ইউএইর সরাসরি প্রতিবেশী। হরমুজ প্রণালীর অপর পাশে ইরান এবং উপসাগরের দক্ষিণে ইউএই। ফলে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা যতই শক্তিশালী হোক, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি থেকে ইউএই নিজেকে পুরোপুরি আলাদা রাখতে পারে না।
২০২৬ সালের মার্চে ইউএই সরকার বলেছিল, তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়নি এবং তাদের ভূখণ্ড, আকাশসীমা বা জলসীমা ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। একই বিবৃতিতে আবুধাবি ইরানি হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকারও পুনর্ব্যক্ত করে।
অর্থাৎ ইউএইর নীতিতে দুটি বিষয় একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে—একদিকে সংঘাতে সরাসরি অংশ না নেওয়ার দাবি, অন্যদিকে হামলা হলে আত্মরক্ষার অধিকার সংরক্ষণ।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইরানের ইউএই-বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হলে ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের দিকে তাকাতে হয়।
এই চুক্তির মাধ্যমে ইউএই ও ইসরায়েলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ইউএইতে আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সেটি পরিচালনার জন্য ইসরায়েলি সেনা পাঠিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে খবর প্রকাশিত হয়।
ইরানের কাছে এই সহযোগিতা স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে বেশি কিছু হিসেবে প্রতিভাত হতে পারে। বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং সরাসরি সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি সামরিক প্রযুক্তি ইউএইতে থাকা তেহরানের জন্য নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে ইরানের এমন মূল্যায়নকে ইউএইর নিজস্ব বক্তব্যের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। আবুধাবি প্রকাশ্যে তাদের ইসরায়েল-সম্পর্ককে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত বলে উল্লেখ করেছে।
ইউএই কি সরাসরি ইরানে হামলা চালিয়েছে?
এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে বিতর্কিত।
আপনার মূল প্রতিবেদনে ইরানের বিভিন্ন সূত্র ও ইসরায়েলি গণমাধ্যমে ইউএইর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার যে অভিযোগের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা নিরাপদ নয়।
বিশেষ করে ইরানের কেশম দ্বীপের একটি পানি বিশুদ্ধকরণ স্থাপনায় হামলার ঘটনায় ইউএইর জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর ইউএইর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সরাসরি তা অস্বীকার করেছিলেন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং যুদ্ধকালীন প্রচারণার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।
যুদ্ধের সময় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম, সামরিক মুখপাত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ছবি, ভিডিও ও গোয়েন্দা-দাবি ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু সেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই না হলে সেগুলোকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
সুতরাং ইউএই সরাসরি ইরানে হামলা করেছে—এমন দাবি করতে হলে নির্ভরযোগ্য স্বাধীন প্রমাণ প্রয়োজন।
হরমুজ প্রণালী কেন পুরো সংকটের কেন্দ্রে?
ইরান-ইউএই উত্তেজনার আরেকটি বড় কারণ হলো হরমুজ প্রণালী।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে হরমুজের গুরুত্ব বিশাল। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাসের একটি বড় অংশ এই জলপথের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়।
২০২৬ সালের সংঘাতের সময় ইউএইর পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইউএইর শিল্প ও জ্বালানিমন্ত্রী সুলতান আল জাবেরও প্রণালী পুনরায় নির্বিঘ্নে চালু করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে ইরানের সামরিক সক্ষমতার একটি বড় অংশই এই অঞ্চলের ভূগোলের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ফলে হরমুজে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে শুধু ইরান ও ইউএই নয়, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েতসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার প্রভাবিত হতে পারে।
ইউএইর ওপর হামলা কেন ইরানের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ?
ইরান যদি ইউএইর ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে, তাহলে সেটি শুধু ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতের বিষয় থাকে না।
ইউএইর বেসামরিক অবকাঠামো, বিমানবন্দর, বন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
২০২৬ সালের সংঘাতে ইউএইতে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রভাব ইতোমধ্যেই অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ওপর পড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানি হামলায় ইউএইর একটি ডেটা সেন্টার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি অবকাঠামোর নিরাপত্তা পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছে।
অর্থাৎ সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, সামরিক স্থাপনা ছাড়িয়ে বেসামরিক অর্থনীতি ও অবকাঠামোও তত বেশি ঝুঁকিতে পড়বে।
ইউএইর অর্থনীতি কেন বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ?
ইউএইর অর্থনৈতিক মডেল অনেকাংশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিমান চলাচল, পর্যটন, বন্দর, জ্বালানি, আর্থিক সেবা ও বৈশ্বিক বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল।
একটি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধ এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আবুধাবির জ্বালানি অবকাঠামো এবং উপসাগরীয় বন্দরগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দুবাইয়ের নতুন বিমানবন্দর প্রকল্পে জ্বালানি অবকাঠামো আরও সুরক্ষিত করার জন্য ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এটি দেখায়, যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না; দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো পরিকল্পনাতেও তার প্রভাব পড়ছে।
ইরান কি ইউএইকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে দেখছে?
ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক বক্তব্যে ইউএইকে কঠোর ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তেহরানের নিরাপত্তা বিবেচনায় ইউএইর গুরুত্ব বেড়েছে।
তবে ‘শত্রু রাষ্ট্র’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং নির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনাকে শত্রুর সামরিক অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
ইরান কোনো নির্দিষ্ট ঘাঁটি বা সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করার ঘোষণা দিলে সেটি পুরো ইউএই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সমান অর্থ বহন করে না।
তবে বাস্তবে হামলা হলে তার প্রভাব রাষ্ট্রীয় সীমারেখা মেনে চলে না। ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করলেও আশপাশের বেসামরিক এলাকা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ইউএইর সামনে কূটনৈতিক ভারসাম্যের কঠিন পরীক্ষা
ইউএইর জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হলো একসঙ্গে তিনটি সম্পর্ক সামলে চলা।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্ক।
দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের সঙ্গে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস-পরবর্তী সহযোগিতা।
তৃতীয়ত, ভৌগোলিক প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক।
এই তিনটি সম্পর্ককে একই সময়ে ভারসাম্যে রাখা সহজ নয়।
একদিকে ইউএই তার পশ্চিমা নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব ছাড়তে চাইবে না। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়াও আবুধাবির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ফলে ইউএইর কূটনীতিতে ‘সংঘাতের বাইরে থাকা, কিন্তু আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখা’—এই দ্বৈত কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইরানের জন্য ইউএই কেন একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি?
ইরানের জন্য ইউএইর ওপর চাপ প্রয়োগের একটি সামরিক সুবিধা থাকতে পারে—কারণ ইউএইতে মার্কিন সামরিক অবকাঠামো রয়েছে।
কিন্তু এর বিপরীতে বড় ঝুঁকিও রয়েছে।
ইউএই উপসাগরীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে বড় ধরনের সামরিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব ইরানের বাণিজ্য, আমদানি, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।
ইরান নিজেও দীর্ঘদিন ধরে ইউএইর বন্দর ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোর মাধ্যমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পণ্য সংগ্রহ করেছে। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়।
এ কারণে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও তেহরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি কী বলছে?
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ইরানি বাহিনী ইউএইর আল-ধাফরা ও আল-মিনহাদ ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থান এবং রাডার ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করার দাবি করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ সতর্কতায় বলা হয়েছে, ইরান প্রকাশ্যে ইউএইতে যুক্তরাষ্ট্র-সম্পর্কিত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করার ইচ্ছা জানিয়েছে এবং চলমান সংঘাতের কারণে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি রয়েছে।
এ থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—ইউএই এখন আর সংঘাতের সম্ভাব্য পার্শ্ববর্তী এলাকা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না; বরং সেখানে থাকা মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর কারণে দেশটি আঞ্চলিক সামরিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ইউএই নিজেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। বরং দুই দেশের সরকারি বক্তব্যের মধ্যে এই বিষয়ে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে?
ইরান-ইউএই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত কতটা দীর্ঘ হয় এবং ইউএই তার ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি নিয়ে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করে তার ওপর।
যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ইউএইর ওপর সামরিক চাপ বাড়তে পারে। আবার কূটনৈতিক সমঝোতা তৈরি হলে আবুধাবি তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করতে পারে।
এক্ষেত্রে ইউএইর অর্থনৈতিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না।
একইভাবে ইরানের জন্যও উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থায়ী অস্থিতিশীলতা অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক নয়।
শেষ কথা
ইরানের যুদ্ধবার্তায় ইউএইর গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। এর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করছে কয়েকটি কৌশলগত বাস্তবতা—ইউএইতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি, ইসরায়েলের সঙ্গে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস-পরবর্তী সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, হরমুজ প্রণালীর ভূকৌশলগত গুরুত্ব এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট।
তবে ইউএইর অবস্থানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আবুধাবি বারবার বলেছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি এবং নিজেদের সরাসরি যুদ্ধের পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে না।
সুতরাং বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু ‘ইরান বনাম ইউএই’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এটি আসলে বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, ইসরায়েল-ইরান বৈরিতা, উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো এবং হরমুজ প্রণালীর ভূরাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ইউএই কি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তার নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রেখেও ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে যেতে পারবে?
আর ইরানের জন্য প্রশ্নটি হলো—মার্কিন সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করতে গিয়ে ইউএইর সার্বভৌম ভূখণ্ডে হামলা কি শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করবে?
এই দুই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের উপসাগরীয় নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
১. Al Jazeera English — Why is Iran increasingly targeting the UAE in its war messaging?
২. UAE Ministry of Foreign Affairs — UAE retains its right to self-defense
৪. UAE Ministry of Foreign Affairs — UAE denies reports regarding Israeli military delegation
৫. AFP — Iran says it attacked US military targets in UAE, Kuwait and other regional countries
৬. Anadolu Agency — Iran says army launched drone attacks on US bases in Bahrain and UAE
৭. Axios — Israel sent Iron Dome system and troops to UAE during Iran war
৮. U.S. Department of State — United Arab Emirates Travel Advisory, August 29, 2026
৯. Reuters — Strait of Hormuz crisis and UAE’s call for reopening the waterway
১০. Reuters — UAE revises AI data-center plans after Iranian attacks
