● LIVE
Bangladesh

একজন যাযাবরের কাছে ঘরকে মনে হয় নীজের হাতে তৈরী এক কারাগার।

Author: Published: Updated: 26/07/2026 Comments: 0 Estimated reading time: 1 min read
একজন যাযাবরের কাছে ঘরকে মনে হয় নীজের হাতে তৈরী এক কারাগার।

মানুষ কেন একটা নির্দিষ্ট স্থানে নিজের অস্তিত্বকে বাঁধে? হাজার বছর ধরে মানুষ নিরাপত্তা আর স্থায়িত্বের নামে নিজেদের চারপাশে প্রাচীর তুলে এসেছে। কিন্তু প্রকৃতি তো কখনো কোনো এক জায়গায় থমকে থাকে না। বাতাস যেমন বাঁধনহারা, মেঘ যেমন দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়, নদী যেমন সাগরের টানে এক অজানা পথ ধরে দৌড়ায়, তেমনি মানুষের আত্মাতেও এক পরিব্রাজকের আকাঙ্ক্ষা থাকে। আমার এই পথচলা কোনো পালিয়ে যাওয়ার গল্প নয়, বরং নিজেকে আর এই বিশাল বিশ্বকে নতুন করে আবিষ্কারের এক অবিরত অনুসন্ধান। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে যাওয়া, অচেনা মানুষের চোখ দিয়ে সময়কে দেখা, আর ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মাঝে নিজের একটুকরো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া—এই তো জীবনের মূল আনন্দ।

যে রাতে আমি প্রথম নিজের শহর ছেড়ে এক অজানা পথের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিলাম, সেদিন রাতে আকাশে আংশিক চাঁদ উঠেছিল। পকেটে সামান্য সম্বল, আর কাঁধে একটা পুরানো ব্যাকপ্যাক। চারপাশে এক অচেনা নিস্তব্ধতা ছেয়ে ছিল, যা শহর থেকে বহু দূরে কাঁচা পথের পাশে আমায় উপহার দিয়েছিল এক পরম অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। প্রথম প্রথম রাত কাটানোর ভাবনাটা মনকে অস্থির করে তুলত। মাথার ওপর তো কাঠের বা সিমেন্টের ছাদ নেই, ঝড় এলে কোথায় যাব, ঝড়-বৃষ্টিতে কোথায় আশ্রয় পাব—এই ভীতি আমার ভেতর বাসা বেঁধেছিল। কিন্তু প্রথম কয়েক রাতের অভিজ্ঞতা সেই বাঁধনটা একেবারে ভেঙে দিল। মেঠো পথের ধারে কোনো এক বড় বটবৃক্ষের নিচে বসে নক্ষত্রখচিত রাতের আকাশ দেখার মুহূর্তটা যেন এক স্বর্গীয় সুখ এনে দেয়। তখন মনে হয়, এত বড় এক রাজকীয় ছাদ তো কেবল কোনো রাজার প্রাসাদেই সম্ভব! সেই ছাদের নিচে আমি, এক যাযাবর, পরম সুখে ঘুমিয়ে পড়ি।

ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই আমার ঠিকানা বদলে যায়। সকালে ঘুম ভেঙে যে নদীর পাড়ে বসি, সেই নদীর পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে এক অজ পাড়াগাঁয়ের চায়ের দোকানে গিয়ে বসি। চায়ের ধোঁয়া ওঠা কাপে হাত রেখে যখন স্থানীয় মানুষের গল্প শুনি, তখন তাদের হাসি-কান্না, জীবনের প্রতিদিনের সংগ্রাম আমার নিজের গল্প হয়ে ওঠে। তাদের জীবনে আমার উপস্থিতি হয়তো মাত্র কয়েক ঘণ্টার, কিন্তু আমার স্মৃতির ঝুলিতে তারা সারাজীবনের জন্য বন্দি হয়ে যায়। একেকটি গ্রাম, একেকটি শহর, বা কোনো এক নির্জন পার্বত্য পথ—প্রতিটি জায়গারই এক নিজস্ব সুবাস আর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। যখন কেউ জিজ্ঞেস করে, “তোমার বাড়ি কোথায় ভাই?”, আমি হেসে আকাশের দিকে হাত তুলে বলি, “যেখানে আমি থামি, সেখানেই আমার ঘর।” এই উত্তর শোনার পর মানুষের চোখের বিস্ময় আর কৌতূহল দেখে আমার খুব আনন্দ হয়।

পার্বত্য অঞ্চলের আঁকাবাঁকা সংকীর্ণ পথ ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় মেঘ যখন এসে মুখে-চোখে জলকণা ছিটিয়ে দেয়, তখন মনে হয় এর চেয়ে আপন ঘর আর কোথায় হতে পারে? পাহাড়ের উচ্চতা মানুষকে বিনয় শেখায়। বিশাল এক পাথুরে পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে যখন আমি নিজেকে নিঃস্ব বলে মনে করি, তখনই প্রকৃতি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। পাহাড়িরা যখন তাদের ছোট্ট কুঁড়েঘরে ডেকে এক কাপ গরম চা বা সামান্য খাবার ভাগ করে নেয়, তখন হৃদয় পূর্ণ হয়ে ওঠে। তাদের সরলতা আমাকে শেখায় যে, পার্থিব ধন-সম্পদ জমানোর নাম জীবন নয়; বরং মানুষের জীবনের আসল স্বাদ নিহিত রয়েছে একাত্বতার অনুভূতিতে। শহরের আলিশান প্রাসাদে যা সচরাচর পাওয়া যায় না, পাহাড়ি মানুষের এই অকৃত্রিম ভালোবাসার আশ্রয়ে তা খুব সহজেই পাওয়া যায়।

মরুভূমির ধূ ধূ বালুচরে যখন একলা হেঁটে চলি, তখন চারপাশের নীরবতা আমাকে ভেতরের গভীরে তাকাতে শেখায়। বালুর ওপর যখন সূর্যাস্তের লালচে আলো ছড়িয়ে পড়ে, তখন চারপাশটা যেন এক রূপকথার জগতে পরিণত হয়। রাত নামলেই মরুভূমির তাপমাত্রা হু হু করে কমে যায়, বইতে শুরু করে শীতল বাতাস। কাঁটাগুল্ম জ্বালিয়ে সেই আগুনের পাশে বসে যখন হাতের তালু গরম করি, তখন সেই আগুনের শিখা যেন অস্তিত্বের অন্য এক সত্যের কথা বলে। আকাশের প্রতিটি নক্ষত্র সেখানে এতো স্পষ্ট ও কাছে মনে হয় যে হাত বাড়ালেই বুঝি ছোঁয়া যাবে! এই নিঃসঙ্গ মরুভূমিও আমার ঘর, এই বিশাল শীতল রাতও আমার পরিবারের সদস্য। যে যাযাবর, তার কাছে সীমানার কোনো অস্তিত্ব নেই। মানচিত্রে যে লাল-নীল দাগগুলো দেখা যায়, সেগুলো মানুষের তৈরি রাজনৈতিক সীমারেখা মাত্র। কিন্তু প্রকৃতি তো কোনো সীমান্ত চেনে না। পাখির মতো মুক্ত ডানা মেলে সে এক দেশ থেকে অন্য দেশে উড়ে যায়, মেঘ যেমন কোনো ভিসা বা পাসপোর্টের পরোয়া না করে দিগন্ত থেকে দিগন্তে ভেসে চলে।

হাজার হাজার মাইল হেঁটে চলার পথে শত শত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। সমুদ্রের গর্জন যখন রাতে তীরের বালুকাবেলায় এসে আছড়ে পড়ে, তখন তার সুর যেন গভীর কোনো সুরের মতো শোনায়। শান্ত নদীর ধারে কাটিয়ে দেওয়া দুপুরগুলো আবার শেখায় কীভাবে স্থির থাকতে হয়। পথ চলতে গিয়ে বহুবার কঠিন বিপদের মুখেও পড়তে হয়েছে। কখনো অঝোর ধারায় টানা বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপতে হয়েছে, কখনো তীব্র শীতে রাতে শোয়ার কোনো উষ্ণ স্থান পাওয়া যায়নি, আবার কখনো নির্জন কোনো বনে বন্যপ্রাণীর ভয়ে বিনিদ্র রাত কাটাতে হয়েছে। কিন্তু এসব দুঃখ-কষ্ট কখনো আমাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। কারণ যাযাবরের জীবনে আরাম-আয়েশই শেষ কথা নয়, বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে তার আসল রূপে গ্রহণ করাই মূল লক্ষ্য।

এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার পথে অসংখ্য ভিন্ন চরিত্রের মানুষের সাথে পরিচয় হয়। ফেরিওয়ালা, দিনমজুর, দূরপাল্লার গাড়িচালক, কিংবা কোনো এক বাউল গায়ক—প্রত্যেকটি মানুষের নিজস্ব একটা জগৎ আছে। যখন কোনো বাউলের একতারার সুরে সুর মিলিয়ে কোনো গাছের তলে সুর ধরি, তখন জীবনের সমস্ত যন্ত্রণা ধুয়েমুছে পরিষ্কার হয়ে যায়। গানের কথামালায় যখন উঠে আসে জীবন আর মৃত্যুর চিরন্তন খেলা, তখন মনে হয় যাযাবর হওয়া আসলে কোনো সাধারণ সিদ্ধান্ত নয়, এটা একটা দর্শনের নাম। সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী না হয়েও কীভাবে সংসারের সমস্ত মায়া-মমতা থেকে মুক্ত হয়ে সব কিছুকে নিজের করে নেওয়া যায়, সেই পথই এই যাযাবর জীবন আমাদের শেখায়।

আজকাল মানুষ বড্ড বেশি একা হয়ে পড়ছে। আধুনিক সুবিধার সব আয়োজন দিয়ে মানুষ আজ নিজের ঘর সাজায়, ড্রয়িংরুমে দামি আসবাবপত্র আনে, ঘরের চারপাশে বড় বড় দেয়াল তোলে সুরক্ষার জন্য। কিন্তু দিনের শেষে সেই মানুষটিই তীব্র মানসিক একাকীত্বে ভোগে। তারা নিজেদের একটা ছোট্ট বাক্সে বন্দি করে ফেলে, যার ফলে বিশাল বিশ্বের অসীম সৌন্দর্যের স্বাদ তাদের নাগালের বাইরে থেকে যায়। আর আমার মতো একজন যাযাবর কোনো কিছু না আঁকড়ে ধরেও পুরো পৃথিবীর সম্পদ উপভোগ করতে পারে। এই আকাশ, এই বাতাস, এই ফুল, এই নদী—সবকিছুই তো আমার। আমার এগুলোকে পকেটে করে বা নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে রাখতে হয় না, কেবল এক পলক দেখেই হৃদয় পূর্ণ করে নেওয়া যায়। এটাই পরম প্রাপ্তি।

ভোরের বাতাসে যখন শিশিরভেজা মাটির গন্ধ ভেসে আসে, তখন বুক ভরে শ্বাস নিই। নতুন এক দিগন্তের পানে আবার পা বাড়াই। পায়ের জুতো জোড়া ক্ষয়ে গেছে অনেক আগেই, চামড়ার ওপর রোদের তীব্র তাপে পড়ার দাগ স্পষ্ট, তবুও চলার আনন্দ কখনো ম্লান হয় না। প্রতিটা নতুন মোড় আমার জন্য নতুন এক চমক নিয়ে অপেক্ষা করে। জানিনা কাল কোথায় গিয়ে থামব, কিংবা আগামী রাতে কোন অদেখা আকাশের নিচে চোখ বুজব। কিন্তু এই অনিশ্চয়তাই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিক। যেখানে ভবিষ্যৎ নির্দিষ্ট নয়, সেখানেই রয়েছে অনন্ত সম্ভাবনা।

আমার ঘরের কোনো নির্দিষ্ট দরজা বা জানালা নেই, কারণ পুরো বিশ্বটাই যে আমার বসবাস করার স্থান। এই পৃথিবীর প্রতিটি মেঠো পথ আমার বারান্দা, প্রতিটি মহাদেশ আমার একেকটি কামরা, আর সব মানুষ আমার পরিবারের আপনজন। কতদিন বেঁচে থাকব তা জানা নেই, তবে যতদিন পায়ের গতি সচল থাকবে, যতদিন বুকের ভেতর নিঃশ্বাস বইবে, ততদিন আমি হেঁটে যাব এই সুন্দর বসুন্ধরার বুকে। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে নিজের পদচিহ্ন একে রেখে যাব না, বরং প্রকৃতির বুকে নিজের অস্তিত্বের সামান্য অংশ মিশিয়ে দিয়ে বলব—হ্যাঁ, আমি এসেছিলাম, আমি দেখেছি, আমি ভালোবেসেছি।

যখন শেষবারের মতো এই পথচলা থমকে যাবে, যেদিন চোখ দুটোর সমনে চিরতরে নেমে আসবে অন্ধকারের পর্দা, সেদিনও আমার কোনো আক্ষেপ থাকবে না। কারণ কোনো চার দেয়ালের অন্ধকার কামরায় নয়, আমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করব আমার আসল ঘরে—এই বিশাল পৃথিবীর উন্মুক্ত কোলে। মাটির সন্তান আমি, এই মাটিতেই আবার বিলীন হয়ে যাব পরম শান্তিতে, মুক্ত আকাশের নিচে এক পরম সুখের ঘুম ঘুমিয়ে।

main Editor July36bd

July36 Editorial Team

Leave a Comment