কাঁদলেন কাঁদালেন একটি সন্তানের স্মৃতি এবং জুলাইয়ের রক্তাক্ত ইতিহাস ‘আমার ছেলেটা অনেক মেধাবী ছিল। আমাকে আদর করে “মম” বলে ডাকত। আমার সন্তানদের মধ্যে আদিলই আমাকে “মম” বলে ডাকত। এখন আর কেউ “মম” বলে ডাকে না। আমাকে ছাড়া সে ঘুমাতে পারত না। সে বলত, মায়ের কাছে সন্তান কখনো বড় হয় না। আজ আমার ছেলে নেই। আমি আমার ছেলেকে ভুলতে পারছি না।’
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন আয়েশা আক্তার। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া আদিল হোসেনের মা। সন্তানের স্মৃতি মনে পড়তেই বারবার ভারী হয়ে উঠছিল তাঁর কণ্ঠ। একটি মায়ের কাছে সন্তান হারানোর বেদনা যে কত গভীর, সেই মুহূর্তে যেন তারই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান আদিল হোসেন। তাঁর মায়ের স্মৃতিচারণের সময় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে যায়। কথার বদলে চারদিকে নেমে আসে নীরবতা। উপস্থিত অনেকের চোখে পানি দেখা যায়। কেউ মাথা নিচু করে বসে থাকেন, কেউ চোখ মুছতে থাকেন। একজন মায়ের কান্না যেন সেখানে উপস্থিত প্রত্যেক মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই উত্তাল জুলাইয়ের দিনগুলোর কাছে।
২০২৫ সালের ২ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ‘জুলাইয়ের মায়েরা’ শীর্ষক অভিভাবক সমাবেশ ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা নিজেদের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও বেদনার কথা তুলে ধরেন। শহীদদের মায়েদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উঠে আসে শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার গল্পও।
আদিলের স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হওয়ার
আয়েশা আক্তার জানান, তাঁর ছেলে আদিল সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চেয়েছিল। দেশের জন্য কাজ করার স্বপ্ন ছিল তার। পরিবারের একজন সদস্য সেনাবাহিনীতে থাকায় ছোটবেলা থেকেই সামরিক পেশার প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
মায়ের ভাষায়, আদিল বলত—একদিন সেও আর্মি অফিসার হবে। দেশের মানুষের জন্য কাজ করবে। ভবিষ্যৎ নিয়ে যে ছেলেটি স্বপ্ন দেখত, সেই ছেলেই একদিন রাজপথে প্রাণ হারাল।
একজন মায়ের কাছে এই স্মৃতিই হয়তো সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা—সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে স্বপ্ন তিনি বছরের পর বছর লালন করেছেন, তা হঠাৎ করেই থেমে যাওয়া। সন্তানের পড়াশোনা, পেশা, সংসার, ভবিষ্যৎ—সবকিছুকে ঘিরে যে পরিকল্পনা ছিল, একটি গুলির শব্দে তার সবকিছু যেন নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
আয়েশা আক্তারের কান্নার মধ্যে তাই শুধু একজন সন্তান হারানোর শোক ছিল না; ছিল একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যতের গল্প।
দুই চোখ হারিয়েও মাহবুবের মায়ের প্রশ্ন
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দুই চোখ হারানো মাহবুবের মা হালিমা বেগমও কথা বলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে তাঁর ছেলে দুই চোখ হারিয়েছে।
তিনি বলেন, যে দেশের জন্য তাঁর ছেলে চোখ হারিয়েছে, সেই দেশ আর তাঁর ছেলে দেখতে পারল না।
এই বক্তব্যের মধ্যে একজন মায়ের অসহায়ত্ব যেমন ফুটে ওঠে, তেমনি ফুটে ওঠে একজন আহত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতার কথাও। চোখের আলো হারানো শুধু একটি শারীরিক ক্ষতি নয়; এটি একজন মানুষের শিক্ষা, কর্মজীবন, চলাফেরা, আত্মনির্ভরতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
হালিমা বেগমের কথায় জানা যায়, আগে তাঁর ছেলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতে আগ্রহী থাকত। এখন সে আর কোথাও যেতে চায় না। মায়ের চোখে সন্তানের এই পরিবর্তনও যেন আরেক ধরনের বেদনা।
তিনি যারা তাঁর ছেলের চোখ নষ্ট করেছে, তাদের বিচার দাবি করেন।
এই বিচার-দাবির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জুলাইয়ের আহতদের জন্য ন্যায়বিচার, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার প্রশ্ন। কারণ আন্দোলনে নিহতদের পরিবার যেমন তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তেমনি আহতদের অনেকেই আজও বহন করছেন সেই সময়ের শারীরিক ও মানসিক ক্ষত।
১৮ মাসের অপেক্ষার পর পাওয়া সন্তান মাবরুর
আরেক শহীদ মাওলানা মাবরুর হোসাইনের মা শাহনাজ বেগমের বক্তব্যও অনুষ্ঠানের পরিবেশকে আরও ভারী করে তোলে।
শাহনাজ বেগম জানান, তাঁদের পরিবারে দীর্ঘদিন কোনো ছেলে সন্তান ছিল না। তিনি সন্তানের আশায় ১৮ মাস রোজা রেখেছিলেন। পরে তাঁর ঘরে জন্ম নেয় মাবরুর হোসাইন।
ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে আলেম বানিয়েছিলেন তিনি। মায়ের চোখে সন্তানটি ছিল অত্যন্ত হিসাবি, পরিমিত ও ভালো স্বভাবের একজন মানুষ। তাঁর জীবনযাপন, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মায়ের ছিল অনেক স্বপ্ন।
কিন্তু সেই সন্তানও আর ঘরে ফিরে আসেনি।
কান্নায় ভেঙে পড়ে শাহনাজ বেগম তাঁর সন্তানের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিচারের দাবি জানান। তাঁর বক্তব্যে একটি রাজনৈতিক দাবিও উঠে আসে, যা ছিল তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও বিচারপ্রত্যাশার প্রকাশ।
একজন মা যখন তাঁর সন্তানের মৃত্যুর কথা বলেন, তখন সেই বক্তব্যের পেছনে থাকে বহু বছরের সম্পর্ক, স্মৃতি, স্বপ্ন এবং ভালোবাসা। তাই এমন বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখলে তার মানবিক গভীরতার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।
মায়েদের কান্নায় ফিরে আসে জুলাইয়ের দিনগুলো
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নারায়ণগঞ্জ ছিল আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, আহত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জে বহু মানুষের হতাহত হওয়ার কথা উঠে এসেছে।
জুলাইয়ের সেই দিনগুলো শুধু রাজপথে থাকা মানুষদের জন্য নয়, ঘরে অপেক্ষা করা মা-বাবাদের জন্যও ছিল ভয়াবহ অনিশ্চয়তার সময়।
একজন মা হয়তো জানতেন তাঁর সন্তান বাইরে গেছে। কিন্তু কখন ফিরবে, আদৌ ফিরবে কি না—তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, চারদিকে গুলির শব্দ, ইন্টারনেট বন্ধ থাকা, কারফিউ এবং বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ—সব মিলিয়ে পরিবারগুলোর উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
অনেক পরিবার হাসপাতাল, থানা, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন স্থানে সন্তানকে খুঁজেছেন। কেউ আহত সন্তানকে হাসপাতালে পেয়েছেন, আবার কেউ পেয়েছেন সন্তানের নিথর দেহ।
এই কারণেই ‘জুলাইয়ের মায়েরা’ শব্দটি কেবল একটি অনুষ্ঠানের নাম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি বেদনাবহ অধ্যায়।
নারায়ণগঞ্জের রাজপথ থেকে পরিবারের অশ্রু
নারায়ণগঞ্জে জুলাইয়ের আন্দোলনের বিস্তার ও সহিংসতার নানা ঘটনা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রথম আলোর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ের দিনগুলোতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। প্রতিবেদনে ওই সময়ে বহু হতাহত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।
রাজপথের সেই আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ হয়তো বিভিন্নভাবে করা যায়। কিন্তু একটি পরিবারের কাছে তার হিসাব অনেক সরল—সন্তান সকালে বের হয়েছিল, আর রাতে আর ফিরেনি।
একজন বাবা হয়তো সন্তানের ব্যবহৃত বইটি হাতে নিয়ে বসে থাকেন। একজন মা হয়তো সন্তানের ঘরের দরজা খুলে অপেক্ষা করেন। বিছানায় পড়ে থাকা পোশাক, টেবিলে থাকা বই, ফোনে জমে থাকা পুরোনো ছবি—সবকিছুই তখন স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
শহীদ পরিবারের জন্য সময় থেমে থাকে না, কিন্তু শোক থামে না।
মায়ের কাছে সন্তান কখনো বড় হয় না
আয়েশা আক্তারের একটি কথা পুরো অনুষ্ঠানের আবেগকে যেন এক বাক্যে ধারণ করে—‘মায়ের কাছে সন্তান কখনো বড় হয় না।’
সন্তানের বয়স ৫ বছর হোক কিংবা ২৫ বছর, মায়ের কাছে সে সন্তানই থেকে যায়। সে যত বড়ই হোক, বাইরে যত দায়িত্বই নিক, মায়ের চোখে তার শৈশবের মুখটি অমলিন থাকে।
তাই কোনো মায়ের কাছে সন্তানের মৃত্যুর অর্থ কেবল একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে হারানো নয়। তার অর্থ হলো নিজের জীবনের একটি অংশ হারানো।
আদিলের মা হয়তো এখনও মনে মনে শুনতে পান তাঁর ছেলের সেই ডাক—‘মম’। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই ডাক আর কোনোদিন তাঁর ঘরে শোনা যাবে না।
এই একটিমাত্র শব্দই একজন মায়ের কাছে একটি সম্পূর্ণ জীবনের স্মৃতি হয়ে উঠেছে।
শহীদ পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: স্মৃতি, ন্যায়বিচার ও ভবিষ্যৎ
জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণ করা শুধু আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে শেষ হওয়ার বিষয় নয়। তাঁদের পরিবারগুলোর সামনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি নানা প্রশ্ন।
প্রথমত, নিহতদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণের প্রশ্ন রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন রয়েছে। তৃতীয়ত, শহীদ পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থত, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জুলাইয়ের ঘটনাগুলো কীভাবে সংরক্ষিত ও উপস্থাপিত হবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।
কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি কেবল স্মরণসভা বা পোস্টারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবারগুলোর বাস্তব জীবনেও সেই ইতিহাস বেঁচে থাকে।
একটি শহীদ পরিবারের শিশুর কাছে তার বাবা বা ভাই হয়তো একটি ছবির মানুষ। একটি আহত পরিবারের কাছে আন্দোলন হয়তো এখনও হাসপাতালের বিছানা, অপারেশন, ওষুধ কিংবা দীর্ঘ চিকিৎসার স্মৃতি।
তাই জুলাইয়ের ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে হলে শহীদ ও আহতদের পরিবারের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলোও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
মায়েদের কান্না যেন আর কোনোদিন না ফিরে আসে
অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, একজন মাকে তাঁর সন্তানের জন্য সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো শব্দ পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। তাঁর বক্তব্যে শহীদ পরিবারের শোকের গভীরতার কথাই উঠে আসে।
তিনি বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।
এই প্রত্যাশার গুরুত্ব এখানেই যে, একটি দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন বা সামাজিক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় মূল্য যেন আর কোনো পরিবারকে দিতে না হয়।
যে মায়েরা সন্তান হারিয়েছেন, তাঁদের জন্য কোনো ক্ষতিপূরণই সন্তানের বিকল্প হতে পারে না। অর্থনৈতিক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রয়োজন হতে পারে, বিচার প্রয়োজন হতে পারে, স্মৃতির সংরক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে—কিন্তু কোনো কিছুই হারানো সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারে না।
তবু রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হলো, সেই পরিবারগুলোকে একা না রাখা।
জুলাইয়ের ইতিহাসে মায়েদের অশ্রুও সাক্ষ্য হয়ে থাকবে
জুলাইয়ের ইতিহাস লিখতে গেলে সাধারণত রাজপথ, আন্দোলন, স্লোগান, সংঘর্ষ, রাজনৈতিক পরিবর্তন কিংবা রাষ্ট্রীয় ঘটনাগুলো সামনে আসে। কিন্তু সেই ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লেখা আছে মায়েদের চোখের জলে।
একজন মা তাঁর সন্তানকে আন্দোলনে যেতে হয়তো উদ্বেগ নিয়ে বিদায় দিয়েছিলেন। কেউ হয়তো বলেছিলেন, ‘সাবধানে থেকো।’ কেউ হয়তো ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন, ‘কোথায় আছিস?’ কেউ হয়তো শেষবারের মতো সন্তানের সঙ্গে কথা বলেছেন।
তারপর একসময় ফোনের ওপাশ থেকে এসেছে মৃত্যুর খবর।
সেই মুহূর্তের কোনো ভাষা নেই।
তাই জুলাইয়ের ইতিহাস শুধু রাজপথের ইতিহাস নয়; এটি ঘরে ঘরে অপেক্ষা করা মায়েদের ইতিহাসও। এটি অসমাপ্ত স্বপ্নের ইতিহাস। এটি হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠের ইতিহাস। এটি আহত চোখের ইতিহাস। এটি সন্তানকে হারিয়ে শূন্য হয়ে যাওয়া মায়ের ইতিহাস।
আয়েশা আক্তার আর তাঁর ছেলে আদিলের সেই ‘মম’ ডাক শুনতে পাবেন না। হালিমা বেগম তাঁর ছেলের চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে পারবেন না। শাহনাজ বেগম তাঁর হারানো সন্তান মাবরুরকে ঘরে ফিরিয়ে আনতে পারবেন না।
কিন্তু তাঁদের স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়।
একটি সমাজ যদি তার ইতিহাসকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে চায়, তবে শুধু বিজয়ের গল্প নয়, বেদনার গল্পও তাকে মনে রাখতে হবে। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর অধ্যায়গুলো অনেক সময় লেখা হয় কাগজে নয়, মায়ের চোখের জলে।
জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের মায়েদের কান্না তাই কেবল শোকের প্রকাশ নয়। এটি তাঁদের হারানো সন্তানদের স্মৃতি ধরে রাখার একটি মানবিক সাক্ষ্য। তাঁদের আকাঙ্ক্ষা, বিচারপ্রত্যাশা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবং একটি নিরাপদ সমাজের প্রত্যাশা—সবকিছু মিলেই জুলাইয়ের উত্তরাধিকারকে আরও বিস্তৃত করে।
যে সমাজ সত্যিই আর কোনো মায়ের বুক খালি দেখতে চায় না, সেই সমাজের দায়িত্ব হবে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো, ন্যায়বিচারের পথকে শক্তিশালী করা এবং নিহত ও আহত পরিবারগুলোর মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা।
কারণ একজন মায়ের কান্না থামানোর সবচেয়ে কার্যকর ভাষা সান্ত্বনা নয়—ন্যায়, নিরাপত্তা ও এমন একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো মা তাঁর সন্তানকে বিদায় দিয়ে আর মৃত্যুর আশঙ্কায় অপেক্ষা করবেন না।
জুলাইয়ের মায়েরা তাঁদের সন্তানদের হারিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সন্তানদের স্মৃতি, তাঁদের স্বপ্ন এবং তাঁদের পরিবারের অশ্রু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দলিল হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
প্রতিবেদনটির মূল ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকাশিত সংবাদ ও প্রাসঙ্গিক নথি:
- জাগো নিউজ — ‘কাঁদলেন কাঁদালেন জুলাই শহীদের মায়েরা’ — নারায়ণগঞ্জে ‘জুলাইয়ের মায়েরা’ অনুষ্ঠানের মূল প্রতিবেদন এবং আয়েশা আক্তার, হালিমা বেগম, শাহনাজ বেগম ও জেলা প্রশাসকের বক্তব্য।
- প্রথম আলো — নারায়ণগঞ্জে অভ্যুত্থানের দিনলিপি: যেভাবে ছড়িয়ে গেল দ্রোহের আগুন — নারায়ণগঞ্জে জুলাই আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড ও বিভিন্ন স্থানে হতাহতের প্রেক্ষাপট।
- জুলাই শহীদ — শহীদদের তথ্যভান্ডার — জুলাই আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের নাম ও বিভিন্ন তথ্যের সংকলন।
- বাংলাদেশ জুলাই যোদ্ধা সংসদ — শহীদ ও জুলাই যোদ্ধাদের তথ্য — আদিল ও মাবরুর হুসাইনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য।
- সরকারি নথি — ‘জুলাইয়ের মায়েরা’ কর্মসূচি সংক্রান্ত প্রস্তুতিমূলক কার্যবিবরণী — জেলা পর্যায়ে ‘জুলাইয়ের মায়েরা’ ও শহীদ পরিবারের সম্মিলন আয়োজনের সরকারি প্রেক্ষাপট।
