জুলাইয়ের গ্রাফিতি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে শুধু রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের একটি অধ্যায় নয়; এটি একই সঙ্গে তৈরি করেছে এক স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ও শিল্পভাষা। সেই ভাষার অন্যতম শক্তিশালী প্রকাশ ছিল জুলাইয়ের গ্রাফিতি।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন শহরের দেয়ালে তখন ফুটে উঠেছিল অসংখ্য গ্রাফিতি, স্লোগান, কবিতা, প্রতিকৃতি ও প্রতীকী চিত্র। কোনোটি ছিল কয়েকটি শব্দের প্রতিবাদ, কোনোটি ছিল শহীদের স্মরণে আঁকা প্রতিকৃতি, আবার কোনোটি ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্নের দৃশ্যপট। তরুণ শিক্ষার্থীদের হাতে আঁকা এসব দেয়ালচিত্রে ছিল ক্ষোভ, শোক, প্রতিবাদ, সাহস এবং নতুন সমাজের আকাঙ্ক্ষা।
দেয়াল যেন হঠাৎ করেই হয়ে উঠেছিল একটি উন্মুক্ত ক্যানভাস। যে কথা হয়তো মঞ্চে বলা কঠিন, যে অনুভূতি সংবাদপত্রের পাতায় পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়, কিংবা যে ক্ষোভকে সাধারণ রাজনৈতিক ভাষা ধারণ করতে পারছিল না—তার অনেকটাই উঠে এসেছিল রং, রেখা, অক্ষর ও প্রতীকের মাধ্যমে।
দেয়াল যখন প্রতিবাদের ভাষা
গ্রাফিতি নতুন কোনো শিল্পমাধ্যম নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামাজিক আন্দোলন, নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদের সঙ্গে দেয়ালচিত্রের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনেও সেই ঐতিহ্য নতুন মাত্রা পায়।
জুলাইয়ের আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ মূলত কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হলেও পরবর্তী সময়ে তা বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয়। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের ভাষাও বদলাতে থাকে। দেয়ালের লেখায় উঠে আসে অধিকার, বৈষম্য, রাষ্ট্র, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে নানা প্রশ্ন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জুলাই আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে গ্রাফিতি আবার ঢাকার দেয়ালে ব্যাপকভাবে ফিরে আসে এবং দেয়াল হয়ে ওঠে প্রতিবাদ ও আত্মপ্রকাশের মাধ্যম।
দেয়ালে আঁকা প্রতিটি ছবি যে একই ধরনের শিল্পমান অনুসরণ করেছিল, তা নয়। অনেক কাজ ছিল অত্যন্ত সরল, কোথাও ছিল অসম্পূর্ণ রেখা, কোথাও বানান বা আঁকার মধ্যে ছিল তাড়াহুড়োর ছাপ। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতাই অনেক ক্ষেত্রে গ্রাফিতিগুলোকে আরও বাস্তব করে তুলেছিল। কারণ এগুলো কোনো গ্যালারির জন্য তৈরি হয়নি; তৈরি হয়েছিল একটি উত্তাল সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিক অনুভূতি প্রকাশের জন্য।
তরুণদের কাঁচা হাতে ইতিহাসের রং
জুলাইয়ের গ্রাফিতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের সরাসরি সম্পৃক্ততা। শিক্ষার্থী, তরুণ শিল্পী এবং সাধারণ মানুষ—অনেকে নিজেদের মতো করে দেয়ালে লিখেছেন, এঁকেছেন এবং অন্যদের আঁকতে উৎসাহ দিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় আন্দোলনের পর দেয়ালগুলোতে প্রতিবাদী বার্তা, কবিতা ও চিত্রকর্ম ছড়িয়ে পড়ে। দ্য ডেইলি স্টার সে সময়ের প্রতিবেদনে লিখেছিল, শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকার দেয়ালগুলো নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। সেখানে প্রতিবাদের বার্তার পাশাপাশি স্বাধীনতা, সম্প্রীতি ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ পেয়েছিল।
এই গ্রাফিতিগুলোর একটি বড় অংশ ছিল ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ। কোনো শিক্ষার্থী হয়তো নিজের দেখা সহিংসতা থেকে একটি ছবি এঁকেছেন, কেউ লিখেছেন একটি প্রশ্ন, কেউ লিখেছেন একটি স্বপ্নের কথা। আবার কেউ শহীদদের স্মরণে তাদের মুখ এঁকেছেন।
এই কারণে জুলাইয়ের গ্রাফিতিকে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। এগুলো একই সঙ্গে ছিল স্মৃতি, শোক, প্রতিবাদ ও স্বপ্নের শিল্পভাষা।
ফোটো তুলেছেন জাহিদুল করিম ও মীর হোসেন
প্রথম ছবিটি ফটোস্টোরির সূচনা হিসেবে রাখা যেতে পারে। পাঠকের সামনে এটি জুলাইয়ের দেয়ালচিত্রের সামগ্রিক আবহ তৈরি করবে। ছবির নিচে ক্যাপশন দেওয়া যেতে পারে:
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আঁকা দেয়ালচিত্র। সময়ের সঙ্গে রং বিবর্ণ হলেও দেয়ালে রয়ে গেছে সেই সময়ের স্মৃতি। ছবি: জাহিদুল করিম ও মীর হোসেন।
প্রতিবাদের পাশাপাশি ছিল বাংলাদেশের স্বপ্ন
জুলাইয়ের গ্রাফিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা। এসব দেয়ালচিত্রে শুধু ক্ষোভ বা প্রতিবাদ ছিল না; ছিল একটি বৈষম্যহীন, মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের প্রত্যাশাও।
২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে পরিচালিত “Colours for Reform” নামের একটি গ্রাফিতি কর্মসূচির লক্ষ্যও ছিল সামাজিক সম্প্রীতি, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বার্তা তুলে ধরা। ওই উদ্যোগে ৫০-এর বেশি শিল্পী ও প্রায় ৩০০ স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত হয়েছিলেন বলে দ্য ডেইলি স্টার জানায়।
অর্থাৎ দেয়ালের শিল্পকর্মগুলো কেবল অতীতের ক্ষোভকে ধারণ করেনি; একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য একটি সামাজিক কল্পনাও তৈরি করেছিল।
কোথাও লেখা হয়েছে স্বাধীনতার কথা, কোথাও ন্যায়বিচারের কথা, কোথাও মানুষের সমান অধিকারের কথা। কোথাও আবার শহীদদের স্মরণে আঁকা হয়েছে মুখচ্ছবি। এসব কাজের মধ্য দিয়ে তরুণরা নিজেদের মতো করে বলতে চেয়েছেন—পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; পরিবর্তন হতে পারে সমাজের মূল্যবোধ, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কেও।
শহীদদের স্মৃতি ও দেয়ালের ভাষা
জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় নিহতদের স্মরণে অসংখ্য গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল। তাদের মধ্যে আবু সাঈদ ও মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে নিহতদের প্রতিকৃতি ও স্মৃতিচিহ্ন বিশেষভাবে নজর কেড়েছিল।
দ্য ডেইলি স্টারের একটি ফটো প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় শহীদদের স্মরণে আঁকা গ্রাফিতির কথা উঠে এসেছে। এসব দেয়ালচিত্রে ব্যক্তিগত শোক ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সামাজিক স্মৃতির অংশে পরিণত হয়েছিল।
একজন শহীদের মুখ দেয়ালে আঁকা হলে সেটি শুধু একটি প্রতিকৃতি থাকে না। পথচারীরা সেটির সামনে দাঁড়ান, কেউ ছবি তোলেন, কেউ পড়েন, কেউ হয়তো সেই ব্যক্তির গল্প জানতে চান। এভাবেই একটি ব্যক্তিগত জীবন একটি সম্মিলিত স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
গ্রাফিতির এই স্মৃতিধারণের ক্ষমতাই সম্ভবত জুলাইয়ের দেয়ালচিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি।
শহীদ ও আন্দোলনের স্মৃতিকে ধারণ করে থাকা দেয়ালচিত্র। ছবি: জাহিদুল করিম ও মীর হোসেন।
ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে রং
সময়ের স্বাভাবিক নিয়মে দেয়ালের রং চিরস্থায়ী নয়। বৃষ্টি, রোদ, ধুলো, যানবাহনের ধোঁয়া, পোস্টার, বিজ্ঞাপন এবং নতুন রঙের প্রলেপ—সবকিছু মিলিয়ে একসময়ের উজ্জ্বল গ্রাফিতিগুলো ধীরে ধীরে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
২০২৫ সালে প্রথম আলোর একটি ফটো প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতির অনেকগুলো এক বছরের মধ্যেই ম্লান হয়ে গেছে বা মুছে যাওয়ার পথে ছিল। কোথাও রং ফিকে হয়েছে, কোথাও পোস্টার-বিজ্ঞাপনে ঢাকা পড়েছে, আবার কোথাও সাদা রঙের প্রলেপে পুরোনো চিত্র আড়াল হয়ে গেছে।
এই বিবর্ণতা কেবল রঙের পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্মৃতি সংরক্ষণের প্রশ্নও।
একটি ঐতিহাসিক ঘটনার ছবি যদি কোনো বইয়ে সংরক্ষিত থাকে, সেটি সহজে নষ্ট হয় না। কিন্তু একটি দেয়ালচিত্র শহরের বাস্তব পরিবেশের অংশ হওয়ায় সময়ের সঙ্গে সেটি ক্ষয়ে যায়। তাই জুলাইয়ের গ্রাফিতিগুলো সংরক্ষণ করার প্রশ্নটি একই সঙ্গে শিল্প, ইতিহাস ও নগর-স্মৃতির প্রশ্ন।

সময়ের ক্ষয়ে বিবর্ণ হয়ে আসা জুলাইয়ের দেয়ালচিত্র। ছবি: জাহিদুল করিম ও মীর হোসেন।
গ্রাফিতি কি ইতিহাসের দলিল?
একটি গ্রাফিতিকে প্রচলিত অর্থে ইতিহাসের দলিল বলা হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার সময় সাধারণ মানুষ কী ভাবছিলেন, কী নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন, কী স্বপ্ন দেখছিলেন—তা বোঝার ক্ষেত্রে গ্রাফিতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান হতে পারে।
দেয়ালে লেখা শব্দগুলো সেই সময়ের মানুষের ভাষা ধারণ করে। বই বা সরকারি নথিতে যে ভাষা সব সময় পাওয়া যায় না, গ্রাফিতিতে তার উপস্থিতি থাকতে পারে।
প্রথম আলোর একটি বিশ্লেষণেও জুলাইয়ের দেয়ালচিত্রকে রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় একটি শৈল্পিক প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনে গ্রাফিতি, স্লোগান ও রঙের ভাষা আন্দোলনের চেতনার দৃঢ় প্রকাশ হয়ে উঠেছিল।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে জুলাইয়ের গ্রাফিতি ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিজ্যুয়াল আর্কাইভ হতে পারে।
দেয়ালের গায়ে লেখা সময়ের ভাষা। ছবি: জাহিদুল করিম ও মীর হোসেন।
শহরের দেয়াল থেকে স্মৃতির আর্কাইভ
গ্রাফিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে পরবর্তী সময়ে এগুলো নথিবদ্ধ ও সংরক্ষণের উদ্যোগও দেখা গেছে। জুলাই-আগস্টের গ্রাফিতি নিয়ে আলাদা বই ও আলোকচিত্রভিত্তিক সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। “The Art of Triumph” নামে একটি গ্রন্থে জুলাই আন্দোলনের সময় ও পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া বহু গ্রাফিতি ও মুরালের ছবি সংরক্ষণ করা হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে এই সংকলনকে আন্দোলনের শিল্প, সত্য ও ইতিহাস নথিবদ্ধ করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেয়ালচিত্রের জীবন স্বভাবতই ক্ষণস্থায়ী। একটি ছবি যতই শক্তিশালী হোক, সেটি বৃষ্টি ও রোদের বিরুদ্ধে স্থায়ী নয়। কিন্তু ছবি তুলে, শিল্পীর পরিচয় সংরক্ষণ করে, স্থান ও সময় নথিভুক্ত করে এবং প্রেক্ষাপটসহ আর্কাইভ তৈরি করলে সেই শিল্পকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে পারে।
আন্দোলনের সময় ও পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া দেয়ালচিত্রের আরেকটি দৃশ্য। ছবি: জাহিদুল করিম ও মীর হোসেন।
সংরক্ষণ মানে শুধু রং নতুন করা নয়
গ্রাফিতি সংরক্ষণের বিষয়টি কিছুটা জটিল। পুরোনো দেয়ালচিত্র নতুন করে রং করলে সেটি দেখতে আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু তখন প্রশ্ন থাকে—মূল শিল্পকর্মের কতটা অবিকৃত থাকে?
২০২৬ সালের আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাইয়ের গ্রাফিতি সংরক্ষণ ও পুনরায় রং করার একটি উদ্যোগ শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আঁকা দেয়ালচিত্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক রেকর্ড হিসেবে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এখানে সংরক্ষণের একটি ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। মূল গ্রাফিতির রং ও রেখা যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ন রাখা, শিল্পীর পরিচয় ও প্রেক্ষাপট নথিভুক্ত করা, ছবির ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা এবং কোন অংশ পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা—এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ সংরক্ষণকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে পারে।
কাঁচা রেখার মধ্যেই ছিল সময়ের সত্য
জুলাইয়ের গ্রাফিতির অনেকগুলো হয়তো পেশাদার শিল্পীর হাতে আঁকা ছিল না। কোথাও রেখা ছিল অসম, কোথাও রং ছিল সীমিত, কোথাও অক্ষর ছিল তাড়াহুড়োর। কিন্তু শিল্পের মূল্য সব সময় কারিগরি নিখুঁততার ওপর নির্ভর করে না।
কখনো কখনো একটি কাঁপা হাতে লেখা বাক্য একটি সময়ের অনুভূতিকে এমনভাবে ধারণ করতে পারে, যা নিখুঁত কোনো চিত্রকর্মও পারে না।
কারণ সেই দেয়ালে আঁকার সময় শিল্পীর সামনে হয়তো ছিল না কোনো দীর্ঘ পরিকল্পনা। ছিল একটি মুহূর্ত, একটি অনুভূতি, একটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। সেই তাৎক্ষণিকতাই জুলাইয়ের গ্রাফিতিকে আলাদা করে।
দ্য ডেইলি স্টারের একটি বিশ্লেষণে জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতিকে তরুণদের অসন্তোষ ও প্রতিবাদের একটি শক্তিশালী ভাষা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন স্লোগান, শহীদদের স্মরণ এবং আন্দোলনের অভিজ্ঞতা কীভাবে দেয়ালচিত্রে উঠে এসেছিল, তারও উল্লেখ রয়েছে।
তরুণদের হাতে আঁকা প্রতিবাদের ভাষা—সময়ের সঙ্গে যার রং বদলেছে, কিন্তু স্মৃতি রয়ে গেছে। ছবি: জাহিদুল করিম ও মীর হোসেন।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাবে জুলাইয়ের দেয়াল?
সময় এগিয়ে যাবে। শহরের ভবন বদলাবে, নতুন রাস্তা তৈরি হবে, পুরোনো দেয়াল ভেঙে নতুন স্থাপনা উঠবে। একসময়ের পরিচিত অনেক দেয়াল হয়তো আর থাকবে না।
কিন্তু সেই দেয়ালে লেখা শব্দগুলো, যদি যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করা যায়, তাহলে ইতিহাসের অংশ হিসেবে টিকে থাকতে পারে।
জুলাইয়ের গ্রাফিতির ক্ষেত্রে তাই শুধু “এগুলো কত সুন্দর” এই প্রশ্নটি যথেষ্ট নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই গ্রাফিতিগুলো কী বলেছিল? কারা এঁকেছিল? কোন পরিস্থিতিতে এঁকেছিল? কোন সামাজিক অনুভূতি এগুলোর পেছনে কাজ করেছিল? এবং সময়ের সঙ্গে সেই অনুভূতিগুলোর কী পরিবর্তন হয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে গ্রাফিতিকে শুধু নগরসজ্জা হিসেবে নয়, একটি সময়ের সাংস্কৃতিক নথি হিসেবে দেখতে হবে।
বিবর্ণ দেয়ালেও রয়ে গেছে জুলাইয়ের স্মৃতি। ছবি: জাহিদুল করিম ও মীর হোসেন।
দেয়ালে লেখা স্বপ্ন
জুলাইয়ের গ্রাফিতির দিকে ফিরে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—দেয়ালগুলো শুধু অতীতের ক্ষোভ বহন করছে না; সেখানে ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষাও লেখা আছে।
একটি প্রজন্ম যখন নিজের হাতে শহরের দেয়ালে ছবি আঁকে, তখন তারা আসলে শহরের সঙ্গে নিজের সম্পর্কও নতুনভাবে প্রকাশ করে। যে শহরের দেয়াল সাধারণত বিজ্ঞাপন, পোস্টার ও রাজনৈতিক স্লোগানে ঢাকা থাকে, সেই দেয়ালই একসময় তরুণদের হাতে পরিণত হয়েছিল তাদের নিজস্ব বক্তব্যের জায়গায়।
সেই বক্তব্যে ছিল প্রতিবাদ, ছিল শোক, ছিল প্রশ্ন, ছিল সাহস। পাশাপাশি ছিল এমন একটি বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা, যেখানে নাগরিকের মর্যাদা, সমতা, মানবিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আজ অনেক গ্রাফিতির রং ফিকে। কোনো কোনোটি প্রায় মুছে গেছে। ধুলো জমেছে, কোথাও পোস্টার লেগেছে, কোথাও দেয়াল নতুন করে রঙ করা হয়েছে। তবু সেগুলোর স্মৃতি মুছে যায়নি।
কারণ গ্রাফিতির আসল শক্তি শুধু তার রঙে নয়; তার শক্তি নিহিত থাকে সে সময়ের মানুষের অনুভূতিকে ধারণ করার ক্ষমতায়।
জুলাইয়ের সেই দেয়ালচিত্র তাই একটি প্রজন্মের কণ্ঠস্বরের দৃশ্যমান রূপ। এগুলো শহরের দেয়ালে আঁকা কিছু ছবি মাত্র নয়—এগুলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক উত্তাল সময়ের স্মৃতি, একটি প্রজন্মের প্রতিবাদ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের দেখা স্বপ্নের রঙিন দলিল।
ফোটো তুলেছেন: জাহিদুল করিম ও মীর হোসেন
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
১. প্রথম আলো — “জুলাইয়ের গ্রাফিতি” — মূল ফটোফিচারের প্রেক্ষাপট ও গ্রাফিতিগুলোর বিবর্ণ হয়ে যাওয়ার তথ্য। জুলাইয়ের গ্রাফিতি — প্রথম আলো
২. প্রথম আলো — “দেয়ালে ফিকে হয়ে আসছে গ্রাফিতি” — এক বছরের মধ্যে গ্রাফিতির রং ফিকে হয়ে যাওয়া, মুছে যাওয়া ও সংরক্ষণের প্রাসঙ্গিকতা। দেয়ালে ফিকে হয়ে আসছে গ্রাফিতি — প্রথম আলো
৩. The Business Standard — “Graffiti: When the spray can is mightier than the sword” — জুলাই আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ে গ্রাফিতির বিস্তার এবং প্রতিবাদের শিল্পভাষা। Graffiti: When the spray can is mightier than the sword
৪. The Daily Star — “In pictures: A revolution told in graffiti” — ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন-পরবর্তী গ্রাফিতি ও মুরালের চিত্র। In pictures: A revolution told in graffiti
৫. The Daily Star — “Graffiti and murals: The new language of freedom in Dhaka” — গ্রাফিতি, মতপ্রকাশ, স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রেক্ষাপট। Graffiti and murals: The new language of freedom in Dhaka
৬. The Daily Star — “Colours for Reform” — শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে গ্রাফিতি সংরক্ষণ ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা। Colours for Reform: Student-led campaign restores Dhaka’s walls
৭. The Daily Star — “Tracing an uprising in strokes” — জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি ও মুরাল নিয়ে আলোকচিত্রভিত্তিক আর্কাইভের তথ্য। Tracing an uprising in strokes
৮. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই গ্রাফিতি সংরক্ষণ কর্মসূচি — ২০২৬ সালে জুলাইয়ের দেয়ালচিত্র সংরক্ষণ ও পুনরায় রং করার উদ্যোগ। DU launches restoration of ‘July graffiti’ across campus