আসসালামু আলাইকুম। আপনারা পড়ছেন ‘কোরআনের আলো’। আমাদের এই প্ল্যাটফর্মে আমরা কোনো ভিত্তিহীন রূপকথা নয়, বরং পবিত্র কোরআন ও নির্ভরযোগ্য তাফসিরের আলোকে তুলে ধরি সত্যের পথে হারিয়ে যাওয়া অজানা ইতিহাস। আজ আমরা আলোচনা করব সূরা আল-বাকারার সেই রোমহর্ষক অধ্যায়— তালুতের নেতৃত্ব, নদীর পানির পরীক্ষা এবং তরুণ দাউদ (আ.)-এর হাতে জালুতের পতনের শ্বাসরুদ্ধকর ইতিহাস। সাথে থাকবে ব্যাবিলনের রহস্যময় হারুত ও মারুতের কাহিনী।

১. একটি ভেঙে পড়া জাতির আর্তনাদ
হযরত মুসা (আ.)-এর পর বহু শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। বনী ইসরায়েল ধীরে ধীরে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হতে লাগল। পাপাচার আর অবাধ্যতা তাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়াল। ফলে এক সময় আল্লাহর সাহায্য তাদের ওপর থেকে উঠে গেল। শত্রু বাহিনী (আমালেকা) তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঘরবাড়ি ধ্বংস হলো, সন্তানদের বন্দি করা হলো এবং সবচেয়ে বড় আঘাত— তাদের পবিত্র ‘তাবুতে সাকিনা’ বা প্রশান্তির সিন্দুকটি শত্রুরা লুট করে নিয়ে গেল।
২. নবী ও রাজার অভিষেক
এই চরম অন্ধকারের মাঝে আল্লাহ তায়ালা তাদের কাছে একজন নবী পাঠালেন (তাফসির অনুযায়ী যার নাম শামুয়েল)। বনী ইসরায়েলের নেতারা তাঁর কাছে এসে আবেদন জানাল, “আমাদের জন্য একজন রাজা ঠিক করে দিন, আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করব।”
নবী তাদের চরিত্র জানতেন, তাই জিজ্ঞেস করলেন, “যুদ্ধ ফরজ হলে তোমরা কি পিছু হটবে না?” তারা সদর্পে উত্তর দিয়েছিল যে তারা লড়বে। কিন্তু যখন যুদ্ধের নির্দেশ এল, অল্প কিছু মুমিন ছাড়া বাকি সবাই মুখ ফিরিয়ে নিল। আল্লাহ তাআলা তালুতকে তাদের রাজা নিযুক্ত করলেন।
তালুতের রাজত্বের প্রমাণ:
বনী ইসরায়েল তালুতের সাধারণ বংশপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুললে নবী (আ.) বললেন, তার রাজত্বের নিদর্শন হিসেবে সেই হারিয়ে যাওয়া ‘তাবুতে সাকিনা’ ফেরেশতারা বহন করে নিয়ে আসবে।
৩. নদীর পানির পরীক্ষা
তালুত যখন সেনাবাহিনী নিয়ে বের হলেন, তখন আল্লাহ তাদের এক কঠিন পরীক্ষা নিলেন। সামনে একটি নদী। নির্দেশ ছিল:
- কেউ পেট ভরে পানি পান করতে পারবে না।
- সর্বোচ্চ এক আঁজলা পানি পান করা যাবে।

তপ্ত মরুভূমির সেই যাত্রায় বিশাল এক অংশ তৃষ্ণার কাছে হেরে গিয়ে প্রাণভরে পানি পান করল এবং তারা যুদ্ধে যাওয়ার যোগ্যতা হারাল। মাত্র সামান্য কিছু মুমিন বান্দা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন।
৪. দাউদ (আ.) ও জালুতের পতন
তালুতের এই ক্ষুদ্র বাহিনী যখন জালুতের বিশাল বাহিনীর সামনে দাঁড়াল, তখন অনেকের মনে ভয় জেগেছিল। কিন্তু মুমিনরা বলেছিল, “কত ছোট ছোট দল আল্লাহর ইচ্ছায় বড় শক্তিশালী দলকে পরাজিত করেছে!”
জালুত যখন দ্বৈরথের আহ্বান জানাল, তখন বনী ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এগিয়ে এলেন এক তরুণ— দাউদ (আ.)। তার হাতে কোনো ঢাল-তলোয়ার ছিল না, ছিল কেবল একটি গুলতি আর কয়েকটি পাথর। আল্লাহর ওপর অগাধ ভরসা রেখে তিনি গুলতি থেকে পাথর ছুড়লেন, যা সরাসরি জালুতের কপালে আঘাত করল। মুহূর্তেই দানবীয় জালুতের পতন ঘটল।
৫. ব্যাবিলনের রহস্য: হারুত ও মারুত
এই ঘটনার অনেক পরে, প্রাচীন ব্যাবিলনের এক যুগে আল্লাহ মানুষের ইমান পরীক্ষার জন্য দুজন ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন— হারুত ও মারুত।
হযরত সুলাইমান (আ.)-এর ইন্তেকালের পর শয়তানরা রটিয়ে দিয়েছিল যে, তিনি জাদুর জোরে রাজত্ব করতেন। মানুষ যখন জাদুর প্রতি ঝুঁকে পড়ল, তখন আল্লাহ হারুত ও মারুতকে পাঠালেন। তারা জাদুর কুফল সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করতেন। তারা কাউকে কিছু শেখানোর আগে বলতেন:
“আমরা কেবল একটি পরীক্ষা, কাজেই তোমরা কুফরি করো না।” (সূরা বাকারা: ১০২)
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, মানুষ তাদের কাছ থেকে নেক আমল না শিখে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর মতো কালো জাদু শিখতে শুরু করল।
আমাদের শিক্ষা

ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, সত্যের আলো সবসময় বিদ্যমান থাকে, কিন্তু মানুষ তার প্রবৃত্তির টানে অনেক সময় অন্ধকারের পথ বেছে নেয়। বনী ইসরায়েল যেমন বারবার পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে, আমাদের জীবনও তেমন পরীক্ষার ক্ষেত্র।
তথ্যসূত্র:
- পবিত্র কোরআন: সূরা আল-বাকারার ২৪৬-২৫১ নম্বর আয়াত।
- তাফসির: তাফসির ইবনে কাসির ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্র।
আপনার যদি এই ইতিহাস টি ভালো লেগে থাকে, তবে শেয়ার করে অন্যদের জানার সুযোগ করে দিন।ইসলামের অজানা ও হৃদয়স্পর্শী ইতিহাস জানতে‘কোরআনের আলো‘-এর সাথেই থাকুন।
