LIVE
🌐আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান হরমুজ সংকট বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থা: ইরান যুদ্ধের প্রভাব কি এবার পৌঁছাবে সাধারণ মানুষের ঘরে?

Author: Published: Updated: 15/09/2026 Comments: 0 Estimated reading time: 17 min read Views: 27 views
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান হরমুজ সংকট বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থা: ইরান যুদ্ধের প্রভাব কি এবার পৌঁছাবে সাধারণ মানুষের ঘরে?

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান হরমুজ সংকট ও ইরান যুদ্ধকে এত দিন প্রধানত সামরিক ও ভূরাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, এর আরেকটি দিক ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট।

তেল, গ্যাস, জ্বালানি, কাঁচামাল, শিল্পপণ্য, খাদ্য পরিবহন, বিমান চলাচল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি।

পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের সংযোগকারী এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা LNG পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় এখন প্রশ্নটি আর শুধু তেলের দাম কত হবে—এতে সীমাবদ্ধ নেই।

বড় প্রশ্ন হলো, এই অস্থিরতা যদি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্বের বাজারে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও পণ্য কতটা স্বাভাবিকভাবে পৌঁছাতে পারবে?

আর সেই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে আগামী মাসগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বাড়বে।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি করিডর। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি রপ্তানি এই অঞ্চলের সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল।

যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও LNG এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও হরমুজকে বৈশ্বিক তেল ও LNG সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ chokepoint হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এই পথের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হলে প্রথম ধাক্কা পড়ে জ্বালানি সরবরাহে। এরপর তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে শিপিং, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ, কৃষি এবং শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে।

অর্থাৎ একটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথের সংকট হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে একটি তথ্যই যথেষ্ট। রয়টার্সের ১৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে Kpler-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ওই সপ্তাহের এক দিনে হরমুজ দিয়ে মাত্র চারটি কমোডিটি জাহাজ চলাচল করেছে, যেখানে যুদ্ধের আগে দৈনিক গড় ছিল প্রায় ১২৫টি।

এটি কেবল শিপিংয়ের পরিসংখ্যান নয়। এটি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত।

যুদ্ধের প্রথম ধাক্কা: জ্বালানি

বড় কোনো যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত সাধারণত প্রথমে দৃশ্যমান হয় জ্বালানি বাজারে। কারণ আধুনিক অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।

একটি পণ্য কারখানায় তৈরি হওয়ার পর ট্রাকে ওঠে। ট্রাক চলে ডিজেল বা অন্য জ্বালানিতে। এরপর পণ্য বন্দর বা বিমানবন্দরে যায়। সেখান থেকে জাহাজ বা বিমানে অন্য দেশে পৌঁছায়। পরে আবার ট্রাক বা রেলপথে বাজারে আসে।

অর্থাৎ তেলের দাম বাড়লে শুধু পেট্রোল বা ডিজেলের দামই বাড়ে না।

পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের খরচ বেড়ে যায়।

বর্তমান সংকটের মাত্রা বোঝাতে বাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৮.৪৯ ডলার এবং WTI ১০৪.৬৮ ডলারে উঠে যায় বলে রয়টার্স জানিয়েছে। সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরে তেল লোডিং বন্ধ হওয়া, লিবিয়ার কয়েকটি তেলক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং হরমুজের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে বাজারে সরবরাহ-ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

ফলে তেলের বাজারে শুধু বর্তমান সরবরাহ নয়, ভবিষ্যতে সরবরাহ কতটা নিরাপদ থাকবে—সেটিও দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।

কেন সাধারণ মানুষ সঙ্গে সঙ্গে সংকট অনুভব করে না?

যুদ্ধ শুরু হলেই পরদিন দোকানের তাক খালি হয়ে যায় না। এর একটি বড় কারণ হলো inventory বা মজুত ব্যবস্থা।

কোম্পানিগুলো সাধারণত কিছুদিন বা কয়েক সপ্তাহের কাঁচামাল ও পণ্য মজুত রাখে। অনেক দেশ কৌশলগত জ্বালানি মজুত রাখে। বড় আমদানিকারকরা বিকল্প সরবরাহকারী খোঁজে। শিপিং কোম্পানি বিকল্প রুট ব্যবহার করে। ব্যবসায়ীরা আগেই পণ্য কিনে রাখে।

এই কারণে সরবরাহ সংকটের প্রভাব সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে সময় লাগে।

সাধারণত ধাপটি এমন:

সরবরাহ ব্যাহত → পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি → পাইকারি দাম বৃদ্ধি → আমদানিকারকের খরচ বৃদ্ধি → খুচরা বাজারে মূল্য বৃদ্ধি

তাই যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিন এবং বাজারে তার পূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব দৃশ্যমান হওয়ার মধ্যে কয়েক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময়ের ব্যবধান থাকতে পারে।

এ কারণেই আগামী কয়েক সপ্তাহ ও মাসের সরবরাহ পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয় ধাক্কা: শিপিং খরচ

তেলের সরবরাহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহনও বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

যেসব জাহাজ হরমুজ দিয়ে চলাচল করতে অনিচ্ছুক বা অক্ষম, তাদের বিকল্প রুট নিতে হতে পারে। আর বিকল্প রুট মানেই অনেক ক্ষেত্রে বেশি দূরত্ব।

বেশি দূরত্ব মানে বেশি জ্বালানি।

বেশি জ্বালানি মানে বেশি পরিবহন খরচ।

এর সঙ্গে যোগ হয় যুদ্ধঝুঁকির কারণে বাড়তি insurance premium এবং security cost।

ফলে একটি জাহাজের মালিকের ব্যয় বাড়ে। এরপর সেই অতিরিক্ত ব্যয় freight rate-এর মাধ্যমে আমদানিকারকের ওপর পড়ে। শেষ পর্যন্ত তার একটি অংশ ভোক্তার পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়।

অর্থাৎ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা শুধু জাহাজ কোম্পানির সমস্যা নয়; এটি শেষ পর্যন্ত ভোক্তার অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে।

তৃতীয় ধাক্কা: প্রাকৃতিক গ্যাস ও LNG

ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব অপরিশোধিত তেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজের মাধ্যমে LNG-এরও উল্লেখযোগ্য বৈশ্বিক বাণিজ্য হয়।

প্রাকৃতিক গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, সার উৎপাদন এবং গৃহস্থালি ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়তে পারে, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং সারের দামও বাড়তে পারে।

রয়টার্সের ১৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সংকটের কারণে বিশ্ব ইতোমধ্যে প্রায় ৩৬ মিলিয়ন টন LNG সরবরাহ হারিয়েছে বলে Shell-এর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এশিয়ার স্পট LNG মূল্য যুদ্ধের আগের প্রায় ১০ ডলার থেকে প্রায় ৩০ ডলার প্রতি MMBtu-এর কাছাকাছি উঠে গিয়েছিল।

অর্থাৎ:

জ্বালানি সংকট → শিল্প ব্যয় বৃদ্ধি → সার উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি → কৃষি ব্যয় বৃদ্ধি → খাদ্যপণ্যের ওপর মূল্যচাপ

এই চক্রটি সরবরাহ সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি।

সার ও কৃষিপণ্যের ওপর প্রভাব

বিশ্বের খাদ্যব্যবস্থা তেল ও গ্যাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

কৃষিতে ব্যবহৃত সার উৎপাদনে প্রচুর শক্তি লাগে। কৃষিযন্ত্র চালাতে ডিজেল লাগে। ফসল সংগ্রহে জ্বালানি লাগে। কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে পরিবহন লাগে। আবার এক দেশ থেকে অন্য দেশে খাদ্য পাঠাতেও জাহাজ লাগে।

তাই দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট হলে খাদ্য উৎপাদন ও পরিবহনের ব্যয় বাড়তে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে যুদ্ধের কারণে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকট দেখা দেবে। বরং ঝুঁকিটি ধাপে ধাপে তৈরি হয়।

প্রথমে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। এরপর পরিবহন ব্যয়। তারপর আমদানির খরচ। সবশেষে তার প্রভাব খুচরা বাজারে পৌঁছে।

এশিয়া কেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

হরমুজের মাধ্যমে পরিবাহিত জ্বালানির একটি বড় অংশ এশিয়ার বাজারে যায়। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় অর্থনীতি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হরমুজ সংকট এশিয়ার LNG বাজারে বিশেষ চাপ তৈরি করেছে। চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশ বিকল্প সরবরাহের দিকে ঝুঁকছে, আবার উচ্চ মূল্যের কারণে কিছু ক্ষেত্রে গ্যাসের পরিবর্তে কয়লা ও তেলের ব্যবহার বাড়ছে।

এশিয়ার শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎপাদনকেন্দ্র।

চীনের শিল্পখাতের ওপর প্রভাব

চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিল্প ও উৎপাদনকেন্দ্র। ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক পণ্য, প্লাস্টিক, সৌর প্যানেলসহ অসংখ্য পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহ চীনের কারখানার সঙ্গে যুক্ত।

চীনের জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে রপ্তানি পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একজন ভোক্তাও শেষ পর্যন্ত তার দৈনন্দিন পণ্যের দামে এর প্রভাব অনুভব করতে পারেন।

এটাই বিশ্বায়িত অর্থনীতির বাস্তবতা।

ভারতের জন্য ঝুঁকি

ভারতও হরমুজ সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষক। দ্রুত বর্ধনশীল এই অর্থনীতি বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।

হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলে ভারতকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। কিন্তু একই সময়ে যদি বিশ্বের অন্য বড় আমদানিকারকরাও একই বিকল্প উৎসের দিকে ছুটে যায়, তাহলে সরবরাহের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

এর প্রভাব পড়তে পারে:

পরিবহন ব্যয়ে, শিল্প উৎপাদনে, বিদ্যুৎ খরচে, আমদানি ব্যয়ে এবং মূল্যস্ফীতিতে।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?

বাংলাদেশ সরাসরি হরমুজ প্রণালির পাশে নয়। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যবাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই হরমুজ সংকটের প্রভাব থেকে বাংলাদেশ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে না।

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, তৈরি পোশাক, কৃষি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।

বিশেষ করে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।

ফলে একই সঙ্গে বাড়তে পারে আমদানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ।

ইউরোপও কেন ঝুঁকির বাইরে নয়?

অনেকে মনে করতে পারেন, ইউরোপ হরমুজের সরাসরি ব্যবহারকারী নয়। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারের অর্থনীতি এত সরল নয়।

তেলের দাম বাড়লে ইউরোপের পরিবহন, বিমান চলাচল, শিল্প, রাসায়নিক উৎপাদন, কৃষি ও লজিস্টিকস—সব খাতেই ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রয়টার্সের ৮ সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজ সংকটের কারণে ইউরোপীয় গ্যাসের দাম ৭৫ ইউরো/MWh-এর ওপরে উঠেছিল এবং ইউরোপের গ্যাস মজুতও বহু বছরের তুলনায় দুর্বল অবস্থায় ছিল।

অর্থাৎ হরমুজের সংকট এশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপের শিল্প প্রতিযোগিতা, জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিমান ভাড়াও বাড়তে পারে

তেলের দাম বাড়লে বিমান চলাচলের খরচও বাড়ে। এয়ারলাইনগুলোর পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ জ্বালানি।

দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট হলে বিমান কোম্পানিগুলো fuel surcharge বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে কার্গো পরিবহনের খরচও বাড়তে পারে।

এর ফলে আন্তর্জাতিক বিমান ভাড়া, পণ্য পরিবহন এবং পচনশীল পণ্যের সরবরাহ ব্যয়বহুল হতে পারে।

পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও এর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।

শিল্প উৎপাদনে “দ্বিতীয় পর্যায়ের” সংকট

সরবরাহ সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাব।

ধরা যাক, একটি কারখানার কাঁচামাল সময়মতো পৌঁছাল না।

কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিল।

উৎপাদন কমলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাবে।

সরবরাহ কমলে দাম বাড়তে পারে।

দাম বাড়লে চাহিদা কমতে পারে।

চাহিদা কমলে কোম্পানি উৎপাদন আরও কমিয়ে দিতে পারে।

এভাবে একটি ছোট supply disruption ধীরে ধীরে বৃহত্তর অর্থনৈতিক মন্থরতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এটি অবশ্যম্ভাবী নয়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি বাস্তব।

কেন সরবরাহ সংকট দৃশ্যমান হতে সময় লাগে?

একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়।

ধরা যাক, কোনো ব্যবসায়ীর গুদামে ৩০ দিনের পণ্য মজুত রয়েছে।

প্রথম সপ্তাহে সরবরাহ বন্ধ হলেও ক্রেতা বড় কোনো পরিবর্তন বুঝবেন না।

দ্বিতীয় সপ্তাহেও বাজার স্বাভাবিক থাকতে পারে।

তৃতীয় সপ্তাহে ব্যবসায়ী নতুন চালান অর্ডার করতে গিয়ে বুঝবেন, পণ্য আসতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে।

তখন তিনি দাম বাড়াতে পারেন।

চতুর্থ সপ্তাহে পাইকারি বাজারে ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

এরপর সেই প্রভাব খুচরা বাজারে পৌঁছাবে।

অর্থাৎ সরবরাহ সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান পর্যায় অনেক সময় যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে আসে না।

মজুত কমে যাওয়ার পর তার প্রকৃত প্রভাব দৃশ্যমান হয়।

তেলের বাজার এখন কী সংকেত দিচ্ছে?

বর্তমান বাজারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—বিনিয়োগকারীরা শুধু আজকের সরবরাহ দেখছেন না; তারা আগামী দিনের সরবরাহ নিয়েও উদ্বিগ্ন।

রয়টার্সের ৯ সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ব স্তরের তুলনায় এখনও অনেক কম। বিভিন্ন শিল্প-তথ্য অনুযায়ী উপসাগরীয় তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব মাত্রার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজের অনিশ্চয়তা তেলের দামে অতিরিক্ত risk premium তৈরি করছে।

১৫ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট ১০৮ ডলারের ওপরে ওঠা দেখায়, সরবরাহ-ঝুঁকি এখনো বাজারের কেন্দ্রীয় উদ্বেগ।

তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে স্থায়ী হলে কী হতে পারে?

এটি কোনো নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়; বরং সম্ভাব্য একটি scenario।

যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১০০ ডলার বা তার ওপরে থাকে, তাহলে প্রথম বড় চাপ পড়তে পারে মূল্যস্ফীতিতে।

তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়ে।

একদিকে অর্থনীতি দুর্বল হতে পারে।

অন্যদিকে জ্বালানি মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।

ফলে সুদের হার কমানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতিতে stagflationary pressure হিসেবে দেখা হয়—অর্থাৎ দুর্বল প্রবৃদ্ধির সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ।

সরবরাহ সংকট বনাম মূল্যস্ফীতি

চাহিদা বেড়ে গেলে যে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয় এবং যুদ্ধের কারণে সরবরাহ কমে গেলে যে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়—দুটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

মানুষের আয় বাড়ল, তারা বেশি পণ্য কিনল, চাহিদা বাড়ল এবং দাম বাড়ল—এটি demand-driven inflation-এর উদাহরণ।

কিন্তু যুদ্ধের কারণে যদি উৎপাদন, জাহাজ চলাচল বা পরিবহন ব্যাহত হয়, তাহলে চাহিদা অপরিবর্তিত থাকলেও সরবরাহ কমে দাম বাড়তে পারে।

এটি supply-side inflation।

বর্তমান ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক ঝুঁকির একটি বড় অংশ এখানেই।

শুধু তেল নয়, কনটেইনার শিপিংও গুরুত্বপূর্ণ

হরমুজকে শুধু তেলবাহী জাহাজের পথ হিসেবে দেখলে সংকটের ব্যাপ্তি কম করে দেখা হবে।

কোনো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলে নিরাপত্তা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হলে অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজও প্রভাবিত হতে পারে।

শিপিং কোম্পানিগুলো তখন রুট পরিবর্তন করতে পারে, জাহাজ আটকে রাখতে পারে, বীমা বাড়াতে পারে কিংবা অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে পারে।

প্রতিটি পদক্ষেপের অর্থ অতিরিক্ত ব্যয়।

আর সেই ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়।

বন্দরগুলোতেও চাপ বাড়তে পারে

বিকল্প রুট ব্যবহার বাড়লে কিছু বন্দরে হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

জাহাজ বাড়বে।

কনটেইনার জমবে।

ট্রাকের চাহিদা বাড়বে।

গুদামের প্রয়োজন বাড়বে।

Loading ও unloading-এর সময়ও বাড়তে পারে।

ফলে supply chain-এর একটি সমস্যা আরেকটি bottleneck তৈরি করতে পারে।

বীমা খরচ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

যুদ্ধঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে জাহাজের insurance premium বাড়ে। কারণ বীমা কোম্পানির ঝুঁকি বেড়ে যায়।

জাহাজ মালিকের ব্যয় বাড়ে।

এই ব্যয় freight rate-এর মধ্যে যুক্ত হয়।

ফলে একই পণ্য আগের তুলনায় বেশি খরচে পরিবহন করতে হয়।

এই অতিরিক্ত খরচ কোনো একটি পর্যায়ে থেমে থাকে না; পুরো supply chain-এর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

খাদ্যপণ্যের দাম কি বাড়বে?

সম্ভাবনা রয়েছে, তবে প্রভাব দেশ ও পণ্যভেদে ভিন্ন হবে।

যেসব দেশ বেশি আমদানিনির্ভর, তাদের ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

তেলের দাম বাড়লে কৃষি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে।

জাহাজ ভাড়া বাড়লে আমদানির খরচ বাড়ে।

মুদ্রার মান দুর্বল হলে আমদানি আরও ব্যয়বহুল হয়।

এই তিনটি একসঙ্গে ঘটলে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।

তবে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং খাদ্যসংকট এক বিষয় নয়। একটি দেশ বিকল্প উৎস থেকে পণ্য আমদানি করতে পারলে শারীরিক ঘাটতি এড়ানো সম্ভব, যদিও বেশি দামে পণ্য কিনতে হতে পারে।

আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক পথ: বাব আল-মান্দেব

হরমুজ একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ chokepoint নয়। বাব আল-মান্দেবও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এই জলপথ দিয়ে লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে জাহাজ চলাচল করে। ফলে একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে বিকল্প রুটের ওপর চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।

১৫ সেপ্টেম্বরের রয়টার্স প্রতিবেদনে হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবেও জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে মূল সমস্যা হলো—একটি বিকল্প রুট তখনই কার্যকর, যখন তার পর্যাপ্ত capacity থাকে।

বিকল্প পথ কি পুরো সংকট সমাধান করতে পারবে?

পুরোপুরি নয়।

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর কিছু বিকল্প pipeline ও export infrastructure রয়েছে। এগুলো হরমুজের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে পারে।

কিন্তু একটি জলপথের সম্পূর্ণ বিকল্প তৈরি করা সহজ নয়।

Pipeline-এর capacity সীমিত।

বন্দরগুলোর capacity সীমিত।

জাহাজের availability সীমিত।

সব ধরনের পণ্য সব রুটে পাঠানোও সম্ভব নয়।

তাই বিকল্প ব্যবস্থা সংকটকে কমাতে পারে, কিন্তু সবসময় সম্পূর্ণ দূর করতে পারে না।

বাজারের সবচেয়ে বড় ভয়: অনিশ্চয়তা

অর্থনীতিতে uncertainty নিজেই একটি খরচ।

একটি কোম্পানি যদি না জানে আগামী মাসে তেলের দাম ৮০ ডলার হবে নাকি ১২০ ডলার, তাহলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারে।

একটি shipping company যদি না জানে কোন রুট নিরাপদ, তাহলে জাহাজ আটকে রাখতে পারে।

একজন importer যদি নিশ্চিত না হন যে পণ্য সময়মতো আসবে কি না, তাহলে অতিরিক্ত inventory তৈরি করতে পারেন।

এই অতিরিক্ত inventory-ও অর্থের খরচ।

অর্থাৎ যুদ্ধের প্রভাব শুধু সরাসরি ক্ষতির মাধ্যমে অর্থনীতিতে প্রবেশ করে না।

অনিশ্চয়তার মাধ্যমেও অর্থনীতিতে এর মূল্য দিতে হয়।

ছোট ব্যবসা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে

বড় multinational কোম্পানির বিকল্প সরবরাহকারী থাকে। বড় warehouse থাকে। আন্তর্জাতিক financing-এর সুযোগ থাকে।

কিন্তু ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন।

একজন ছোট importer-এর shipping cost যদি ৩০ বা ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়, তাহলে পুরো ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া সবসময় সম্ভব নয়।

ফলে profit margin কমে যেতে পারে।

কিছু ব্যবসা উৎপাদন কমাতে পারে।

কিছু কর্মী কমাতে পারে।

কিছু ব্যবসা সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে যেতে পারে।

চাকরির বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে

দীর্ঘস্থায়ী supply shock হলে পরোক্ষভাবে চাকরির বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে পরিবহন, উৎপাদন, নির্মাণ, বিমান চলাচল, পর্যটন এবং আমদানি-রপ্তানিনির্ভর ব্যবসাগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে।

তবে প্রভাব সব দেশে একই হবে না।

কিছু জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ বরং উচ্চ মূল্যের কারণে বেশি আয় করতে পারে।

অর্থাৎ যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্বজুড়ে সমান নয়।

কারা লাভবান হতে পারে?

যেকোনো supply shock-এর মধ্যেও কিছু খাত লাভবান হতে পারে।

উচ্চ তেলের দামে তেল উৎপাদক কোম্পানির আয় বাড়তে পারে।

বিকল্প জ্বালানির চাহিদা বাড়তে পারে।

জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির বাজার সম্প্রসারিত হতে পারে।

বিকল্প shipping route পরিচালনাকারী কোম্পানিও বাড়তি ব্যবসা পেতে পারে।

তবে সামগ্রিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য কি নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে?

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি অনিশ্চয়তা সরকার ও কোম্পানিগুলোকে বিকল্প শক্তির দিকে দ্রুত যেতে উৎসাহিত করতে পারে।

রয়টার্সের আগস্টের বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, হরমুজ সংকট ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি দেশকে সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি, জ্বালানি দক্ষতা ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ফলে যুদ্ধের একটি দীর্ঘমেয়াদি structural consequence হতে পারে—জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো নিজেদের শক্তি নিরাপত্তা নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে।

ডলার ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ

তেলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ ডলারে হয়। তাই তেলের দাম বাড়লে আমদানিকারক দেশগুলোর ডলারের চাহিদা বাড়তে পারে।

একই পরিমাণ তেল কিনতে যদি বেশি ডলার লাগে, তাহলে আমদানিনির্ভর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে।

মুদ্রার মান দুর্বল হলে একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে আরও বেশি স্থানীয় মুদ্রা প্রয়োজন হয়।

ফলে তৈরি হতে পারে একটি চাপের চক্র:

জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি → আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি → মুদ্রার ওপর চাপ → মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি

উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এই চক্র বিশেষভাবে কঠিন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কঠিন পরীক্ষা

জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দ্বিধায় পড়ে।

অর্থনীতি দুর্বল হলে সুদের হার কমানো দরকার।

কিন্তু জ্বালানি মূল্যস্ফীতি বাড়লে সুদের হার কমানো ঝুঁকিপূর্ণ।

উচ্চ সুদের হার ঋণের খরচ বাড়ায়, বিনিয়োগ কমাতে পারে, আবাসন বাজারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং ব্যবসার সম্প্রসারণ ধীর করে দিতে পারে।

অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের একটি যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক কোনগুলো?

বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য তিনটি সূচকের দিকে বিশেষ নজর রাখা জরুরি।

প্রথমত, হরমুজ প্রণালিতে দৈনিক জাহাজ চলাচল।

যদি জাহাজ চলাচল দ্রুত স্বাভাবিক হতে শুরু করে, সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি কমবে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক তেলের দাম।

ব্রেন্ট যদি দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তাহলে সরবরাহ সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

তৃতীয়ত, বিকল্প রুট ও পাইপলাইনের কার্যকারিতা।

বিকল্প পথে কতটা জ্বালানি বিশ্ববাজারে পৌঁছানো যাচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ

প্রথম পরিস্থিতি: দ্রুত সমাধান

যদি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং হরমুজে জাহাজ চলাচল দ্রুত স্বাভাবিক হয়, তাহলে বাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে।

তেলের দাম কমতে পারে।

শিপিং স্বাভাবিক হতে পারে।

বীমা খরচ কমতে পারে।

সরবরাহব্যবস্থা ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হতে পারে।

এটি সবচেয়ে ইতিবাচক পরিস্থিতি।

দ্বিতীয় পরিস্থিতি: দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা

হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও যদি জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় কম থাকে, তাহলে উচ্চ পরিবহন ব্যয়, তেলের ঝুঁকি-প্রিমিয়াম, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব এবং মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

এটি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হওয়া একটি অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

তৃতীয় পরিস্থিতি: বড় সরবরাহ ধাক্কা

যদি সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বা shipping routes দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সংকট অনেক বেশি গুরুতর হতে পারে।

তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে।

LNG বাজারে চাপ বাড়তে পারে।

শিপিং খরচ বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি আবার তীব্র হতে পারে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এটাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি।

কেন এখনই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই?

সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি বাস্তব হলেও আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।

বিশ্ব অর্থনীতির কিছু buffer রয়েছে।

বিভিন্ন দেশের strategic reserves আছে। বিকল্প pipeline রয়েছে। কিছু উৎপাদক দেশ উৎপাদন বাড়াতে পারে। জাহাজ বিকল্প রুট ব্যবহার করতে পারে। আবার উচ্চ মূল্য চাহিদা কমিয়ে supply-demand balance পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ সংকট মানেই বিশ্বব্যাপী পণ্যশূন্যতা নয়।

বড় ঝুঁকি হলো:

দাম বৃদ্ধি, সরবরাহে বিলম্ব এবং অনিশ্চয়তা।

ভোক্তাদের জন্য এর অর্থ কী?

সাধারণ মানুষের কাছে সংকটের প্রভাব সাধারণত ধীরে ধীরে পৌঁছায়।

প্রথমে জ্বালানির দাম।

তারপর পরিবহন ব্যয়।

এরপর আমদানিকৃত পণ্য।

তারপর খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।

তবে সব পণ্যের দাম একসঙ্গে বাড়বে না। আন্তর্জাতিক shipping-এর ওপর যেসব পণ্যের নির্ভরতা বেশি, সেগুলো তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকবে।

ব্যবসার জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা

বর্তমান সংকট আবারও দেখিয়ে দিচ্ছে—

শুধু সস্তা সরবরাহকারী খুঁজে পাওয়া যথেষ্ট নয়; supply chain resilience-ও জরুরি।

একটি কোম্পানির একাধিক supplier থাকা উচিত।

বিকল্প shipping route থাকা উচিত।

প্রয়োজনীয় inventory থাকা উচিত।

জ্বালানি ও currency risk বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

এবং geopolitical risk-এর জন্য contingency plan থাকা দরকার।

যেসব প্রতিষ্ঠান একটি দেশ, একটি supplier বা একটি shipping route-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, তারা বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় পরীক্ষা

ইরান যুদ্ধ এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাত নয়।

এটি বিশ্বায়িত অর্থনীতির জন্যও একটি বড় পরীক্ষা।

একটি সংকীর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল কমে গেলে প্রথমে তেলের দাম বাড়ে।

তারপর পরিবহন ব্যয় বাড়ে।

তারপর উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।

তারপর পণ্যের দাম বাড়ে।

তারপর মূল্যস্ফীতি বাড়ে।

এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি কঠিন হয়ে ওঠে।

সবশেষে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধীর হয়ে যেতে পারে।

এই chain reaction-ই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিক।

শেষ কথা: যুদ্ধের আসল মূল্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়

ইরান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সামরিক ঘাঁটি কিংবা ধ্বংস হওয়া অবকাঠামোর হিসাব দিয়ে বোঝা যাবে না।

এর প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য আরও বিস্তৃত।

একটি যুদ্ধ যখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ energy chokepoint-কে অস্থিতিশীল করে, তখন তার প্রভাব সীমান্তে আটকে থাকে না।

যে মানুষটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসবাস করেন, তিনিও শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব অনুভব করতে পারেন—

পেট্রোলের দামে,

বিদ্যুতের বিলে,

বিমান টিকিটে,

খাদ্যের দামে,

শিল্পপণ্যের মূল্যে,

এমনকি দৈনন্দিন জীবনের সামগ্রিক ব্যয়েও।

বর্তমান তথ্য বলছে, হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনও যুদ্ধ-পূর্ব স্বাভাবিকতার তুলনায় অত্যন্ত কম। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে এবং LNG বাজারেও সরবরাহ সংকটের প্রভাব স্পষ্ট।

তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আতঙ্ক নয়—পর্যবেক্ষণ।

বিশ্বকে নজর রাখতে হবে তিনটি বিষয়ে:

১. হরমুজ প্রণালিতে দৈনিক জাহাজ চলাচল কতটা বাড়ছে বা কমছে।

২. ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কোথায় স্থিতিশীল হচ্ছে।

৩. বিকল্প রুট ও পাইপলাইনের মাধ্যমে কতটা জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।

এই তিনটি সূচক আগামী দিনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দিতে পারে।

শেষ পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কে সামরিকভাবে জয়ী হবে, তা নয়।

আরও বড় প্রশ্ন হলো—

বিশ্ব অর্থনীতি কতদিন এই সরবরাহ সংকট সামলাতে পারবে?

আর যদি হরমুজের অস্থিরতা আরও দীর্ঘ হয়, তাহলে আজকের বাজারের অস্বস্তি আগামী দিনে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।

কারণ যুদ্ধের গোলা যেখানে পড়ে, তার অর্থনৈতিক অভিঘাত সেখানেই থেমে থাকে না।

তা ছড়িয়ে পড়ে জ্বালানি থেকে পরিবহন, পরিবহন থেকে শিল্প, শিল্প থেকে বাজার—আর শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় মানুষের ঘরে।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

  1. Reuters — Hormuz traffic dwindles after Middle East attacks intensify, 15 September 2026 — হরমুজে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া ও যুদ্ধ-পূর্ব দৈনিক গড়ের তুলনা। Reuters প্রতিবেদন
  2. Reuters — Oil jumps nearly $3 as Saudi export halt, Libya outages stoke supply fears, 15 September 2026 — ব্রেন্ট ও WTI-এর সাম্প্রতিক মূল্য এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ঝুঁকি। Reuters তেলবাজার প্রতিবেদন
  3. Reuters — LNG demand in China, India and Pakistan expected to rebound after US-Iran war ends, 15 September 2026 — LNG সরবরাহ সংকট, এশিয়ার বাজার ও মূল্যবৃদ্ধি। Reuters LNG প্রতিবেদন
  4. Reuters — One third of Gulf oil is still missing despite ‘dark crossings’, 9 September 2026 — উপসাগরীয় তেল রপ্তানি, হরমুজের মাধ্যমে কমে যাওয়া সরবরাহ এবং তেলের বাজারের ঝুঁকি। Reuters তেল সরবরাহ বিশ্লেষণ
  5. Reuters — Asia’s oil industry prepares for an extended disruption, 10 September 2026 — এশিয়ার জ্বালানি বাজার, হরমুজ এবং দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি। Reuters এশিয়া ও হরমুজ বিশ্লেষণ
  6. Reuters — Europe’s winter gas drama could leave deep scars, 8 September 2026 — ইউরোপীয় গ্যাসের দাম, মজুত এবং হরমুজ সংকটের প্রভাব। Reuters ইউরোপীয় গ্যাস বিশ্লেষণ
  7. Reuters — US-Iran war spurs Europe, Asia to boost renewables, 26 August 2026 — জ্বালানি সংকটের ফলে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রবণতা। Reuters নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশ্লেষণ
  8. Reuters — Qatari, UAE LNG cargoes transferred via ship-to-ship outside Strait of Hormuz, 2 September 2026 — হরমুজ সংকটের মধ্যে LNG সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা ও এশিয়ার বাজার। Reuters LNG শিপিং প্রতিবেদন
  9. Reuters — Making Hormuz worthless is a long game, 14 September 2026 — হরমুজের বিকল্প pipeline ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ে বিশ্লেষণ। Reuters জ্বালানি অবকাঠামো বিশ্লেষণ
👁 27 views

Mamunur RASHID

Mamunur RASHID is the editor and writer of July36 Chronicles, an independent digital publication covering Bangladesh, international affairs, history, society and current events. He focuses on presenting informative, contextual and responsibly sourced stories for Bengali-speaking readers.

Leave a Comment