সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শ্রমমন্ত্রী লোরি শ্যাভেজ-ডিইমার পদত্যাগ করছেন বলে সোমবার হোয়াইট হাউস প্রশাসন ঘোষণা করেছে। একজন অধীনস্থ কর্মচারীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক এবং কর্মক্ষেত্রে মদ্যপানসহ বেশ কিছু গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ ওঠার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন।
ট্রাম্পের মুখপাত্র স্টিভেন চেয়াং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, “শ্রমমন্ত্রী লোরি শ্যাভেজ-ডিইমার বেসরকারি খাতে একটি পদে যোগ দেওয়ার জন্য প্রশাসন ত্যাগ করছেন। আমেরিকান শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, ন্যায্য শ্রম আইন বাস্তবায়ন করা এবং আমেরিকানদের জীবনমান উন্নয়নে অতিরিক্ত দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে তিনি নিজের ভূমিকায় অসাধারণ কাজ করেছেন।”
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম এবং অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডির পর শ্যাভেজ-ডিইমার হলেন তৃতীয় ক্যাবিনেট সদস্য—এবং তারা সকলেই নারী—যারা প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদে পদত্যাগ করলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) শ্যাভেজ-ডিইমার লিখেছেন: “এই ঐতিহাসিক প্রশাসনে সেবা করা এবং আমার জীবনের সেরা প্রেসিডেন্টের অধীনে কাজ করতে পারাটা অত্যন্ত সম্মান ও গৌরবের বিষয় ছিল।”
তবে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার পরই মূলত শ্যাভেজ-ডিইমারের এই বিদায় নিশ্চিত হলো। পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ ওঠার পর শ্রমমন্ত্রী এবং তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা বর্তমানে সেই দপ্তরের ‘ইন্সপেক্টর জেনারেল’ (আইজি)-এর অধীনে তদন্তের মুখোমুখি আছেন।
গত মার্চ মাসে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, শ্যাভেজ-ডিইমারের বিরুদ্ধে তার নিজস্ব নিরাপত্তা দলের এক সদস্যের সাথে প্রেমের সম্পর্ক রাখা, নিজের অফিসে মদের “গোপন মজুদ” রাখা এবং ব্যক্তিগত ভ্রমণের জন্য সরকারি তহবিল ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। একই সাথে তার উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিকে বিভিন্ন সরকারি অনুদান পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।
গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক টাইমসের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ইন্সপেক্টর জেনারেল এমন কিছু তথ্য খতিয়ে দেখছেন যা থেকে জানা যায় যে শ্যাভেজ-ডিইমার, তার শীর্ষ উপদেষ্টারা এবং তার পরিবারের সদস্যরা নিয়মিতভাবে তরুণ স্টাফদের ব্যক্তিগত বার্তা এবং অনুরোধ পাঠাতেন। পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, শ্যাভেজ-ডিইমারের স্বামী ও বাবাও তরুণী কর্মীদের ব্যক্তিগত টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছিলেন।
কেলেঙ্কারি এখানেই শেষ হয়নি। শ্রমমন্ত্রীর স্বামী শন ডিইমার—পেশায় একজন অ্যানাস্থেসিওলজিস্ট (অবেদনবিদ)—কমপক্ষে দুজন নারী কর্মীর আনা যৌন নিপীড়নের অভিযোগের পর তাকে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। ওই ভুক্তভোগী নারীরা কর্মকর্তাদের জানান যে ওয়াশিংটনের কনস্টিটিউশন অ্যাভিনিউতে অবস্থিত মন্ত্রণালয়ের ভবনের ভেতরেই শন ডিইমার তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত ও আপত্তিকরভাবে স্পর্শ করেছিলেন।
শন ডিইমারের আইনজীবী অবশ্য এই অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং দাবি করেছেন যে এটি তার স্ত্রীকে পদ থেকে সরানোর একটি চক্রান্ত। পুলিশ এবং প্রসিকিউটররা এই ঘটনায় কোনো ফৌজদারি মামলা করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে ধারণা করা হচ্ছিল যে ইন্সপেক্টর জেনারেলের তদন্তটি একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে এবং তদন্ত চলাকালীনই মন্ত্রণালয়ের অন্তত চারজন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত হতে হয়েছে।
লুইজিয়ানার রিপাবলিকান সিনেটর জন কেনেডি সোমবার বলেন, “আমি মনে করি মন্ত্রী পদত্যাগ করে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন।”
শ্যাভেজ-ডিইমার, যিনি ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড অব টিমস্টার্স ইউনিয়নের এক সদস্যের মেয়ে, এর আগে ওরেগন থেকে নির্বাচিত একজন রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান ছিলেন। নিজের নির্বাচনী এলাকায় ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সমর্থন থাকলেও, এক মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৪ সালের পুনর্নির্বাচনে তিনি হেরে যান।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শ্রমিক নীতি নিয়ে সংশয়ে থাকা ইউনিয়নগুলো প্রথমে ট্রাম্পের এই শ্যাভেজ-ডিইমারকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিল। গত বছরের মার্চ মাসে সিনেটে ৬৭-৩২ ভোটে শ্যাভেজ-ডিইমারের মনোনয়ন নিশ্চিত হয়, যেখানে এক ডজনেরও বেশি ডেমোক্র্যাট সদস্য রিপাবলিকানদের সাথে যোগ দিয়ে তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন।
সোমবার শ্যাভেজ-ডিইমার এক্সে (X) লিখেছেন: “শ্রম মন্ত্রণালয়ে কাজ করার সময় আমি গর্বিত যে আমরা ব্যবসা এবং শ্রমের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনা এবং সবসময় আমেরিকান শ্রমিকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লক্ষ্য পূরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। আমরা ভালো আয়ের কর্মসংস্থানের নতুন পথ তৈরি করেছি, এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শ্রমিকদের দক্ষ করে তুলেছি, প্রেসক্রিপশনের ওষুধের দাম কমাতে পদক্ষেপ নিয়েছি, অবসরকালীন নিরাপত্তা বাড়াতে কাজ করেছি এবং আরও অনেক কিছু করেছি।”
তবে তার মেয়াদকালে, বিশ্বজুড়ে শিশুশ্রম ও দাসশ্রম মোকাবেলায় শ্রম মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগের দেওয়া মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক অনুদান বাতিল করে দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। এর ফলে গত দুই দশকে বিশ্বব্যাপী শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৭৮ মিলিয়ন কমিয়ে আনতে সাহায্য করা ওই গুরুত্বপূর্ণ কাজটির অবসান ঘটে।
এছাড়াও, এই মন্ত্রণালয় কর্মক্ষেত্রের ৬০টিরও বেশি নিয়মকানুন বাতিল বা পুনর্লিখন করার উদ্যোগ নেয়, যেগুলোকে তারা “অপ্রচলিত” বলে মনে করেছিল। এই বাতিলের তালিকায় হোমকেয়ার কর্মী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ন্যূনতম মজুরির বাধ্যবাধকতা এবং খনিতে ক্ষতিকারক উপাদানের সংস্পর্শ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়মগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পদক্ষেপটি ইউনিয়ন নেতা এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের তীব্র নিন্দার মুখে পড়ে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে আরও ছিল—নির্মাণাধীন এলাকায় নিয়োগকর্তাদের পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করার বাধ্যবাধকতা এবং কৃষি শ্রমিকদের জন্য নিয়োগকর্তার দেওয়া যানবাহনে সিটবেল্ট রাখার নিয়মটি বাতিল করা।
স্টিফেন চেয়াং জানিয়েছেন যে কেইথ সোন্ডারলিং আপাতত ভারপ্রাপ্ত শ্রমমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
(এই প্রতিবেদনে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP)-এর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে)
