বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে নীরব অথচ শক্তিশালী চালিকাশক্তিগুলোর একটি হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। দেশের লাখ লাখ পরিবার, অসংখ্য ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন এবং দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের ঘামঝরা উপার্জন। তারা শুধু পরিবারের জন্য অর্থ পাঠান না—তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে এবং আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা বাড়ায়।
এই মানুষগুলোকে তাই শুধু ‘প্রবাসী’ বা ‘অভিবাসী শ্রমিক’ হিসেবে দেখলে চলবে না। তারা বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনের সারির যোদ্ধা। তারা পরিবার থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকে শ্রম দেন, ঝুঁকি নেন, অনেক সময় প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করেন এবং সেই উপার্জনের একটি বড় অংশ দেশে পাঠান। রাষ্ট্র যখন তাদের অবদানের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভর করে, তখন তাদের ন্যায্য দাবি পূরণ করা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়—এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বও।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসীদের অধিকার, পাসপোর্ট সেবা, বিমানবন্দরে হয়রানি, অভিবাসন ব্যয়, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রতারণা, দূতাবাসের সেবা এবং বিদেশে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সংসদসহ বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও প্রবাসী কল্যাণে নতুন উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা, নিরাপদ অভিবাসন, দক্ষতা যাচাই, জরুরি সহায়তা এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সহজ করার মতো উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—ঘোষণা আর বাস্তবায়নের মধ্যে যে বিশাল দূরত্ব রয়েছে, সেটি কি এবার সত্যিই কমবে?
রেমিট্যান্স–যোদ্ধারা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার উত্তর পাওয়া যায় সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেই। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশের বেশি বেড়েছিল।
২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রথম ২৫ দিনেই দেশে প্রায় ২.৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.৬ শতাংশ বেশি।
অর্থাৎ দেশের অর্থনীতির কঠিন সময়ে যখন বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন বাড়ে, তখন বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরাই বড় একটি ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়ান।
কিন্তু এই অর্থ দেশে আসার পেছনে যে মানুষটির শ্রম রয়েছে, তার জীবন কতটা নিরাপদ?
এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থ পাঠানো মানুষটির মর্যাদা কোথায়?
একজন প্রবাসী শ্রমিক বিদেশ যাওয়ার আগে অনেক সময় নিজের জমি বিক্রি করেন, ধার করেন, ব্যাংক ঋণ নেন অথবা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন। বিদেশে গিয়ে সেই ঋণ পরিশোধ করতে তাকে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।
অথচ দেশে ফেরার সময় কিংবা কোনো সরকারি সেবা নিতে গিয়ে অনেকেই অভিযোগ করেন—তাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হয় না।
পাসপোর্ট নবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, বিভিন্ন দপ্তরে হয়রানি, বিমানবন্দরে অস্বস্তিকর আচরণ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, নিয়োগে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং বিদেশে সমস্যায় পড়লে দ্রুত সহায়তা না পাওয়া—এসব অভিযোগ নতুন নয়।
২০২৬ সালের জুনে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা প্রবাসীদের পাসপোর্ট সেবা, বিমানবন্দরে হয়রানি, নিয়োগ সংস্থার প্রতারণা, উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, মজুরি বঞ্চনা এবং বিদেশে নিরাপত্তার মতো সমস্যাগুলো তুলে ধরেছেন।
যে মানুষটি দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন, তার নিজের দেশের মাটিতে কেন তাকে একটি সেবার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।
বিমানবন্দরে সম্মান—এটি বিলাসিতা নয়, অধিকার
প্রবাসীদের জন্য বিমানবন্দর হলো দেশের সঙ্গে তাদের প্রথম ও শেষ বড় সংযোগস্থল। বিদেশে যাওয়ার সময় একজন শ্রমিকের চোখে থাকে স্বপ্ন; দেশে ফেরার সময় থাকে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পরিবারের কাছে ফিরে আসার আনন্দ।
কিন্তু যদি বিমানবন্দরে তাকে হয়রানি, অযথা জিজ্ঞাসাবাদ, অব্যবস্থাপনা কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়—এটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির প্রশ্ন।
প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কসহ বিভিন্ন সেবা কাঠামো ইতোমধ্যে রয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক অভিবাসী যাত্রীদের ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা, রেমিট্যান্স, কাস্টমস ও পরিবহন বিষয়ে সহায়তা দেয়।
কিন্তু কাঠামো থাকা আর কার্যকর সেবা পাওয়া এক বিষয় নয়।
সরকারের উচিত বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য একটি সত্যিকারের ‘ডিগনিটি করিডর’ তৈরি করা—যেখানে একজন রেমিট্যান্স–যোদ্ধা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং তার প্রাপ্য সম্মান পাবেন।
অভিবাসন ব্যয় কমানো এখন সময়ের দাবি
বিদেশে যাওয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো অভিবাসন ব্যয়।
একজন শ্রমিক যদি বিদেশে যাওয়ার জন্য অস্বাভাবিক পরিমাণ টাকা ব্যয় করেন, তাহলে বিদেশে গিয়ে তার প্রথম কয়েক বছর চলে যায় সেই ঋণ পরিশোধ করতে। ফলে রেমিট্যান্স পাঠানোর সক্ষমতা কমে যায়, পরিবার ঋণের বোঝায় পড়ে এবং শ্রমিক নিজেও আর্থিক ঝুঁকিতে থাকেন।
২০২৬ সালের আগস্টে শ্রম অভিবাসন নিয়ে একটি অংশীজন পরামর্শ সভায় অভিবাসন ব্যয় কমানো, শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণ, নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা, ফেরত আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন এবং ডিজিটাল সেবা আধুনিক করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এখন প্রয়োজন কথাকে নীতিতে এবং নীতিকে বাস্তব ব্যবস্থায় পরিণত করা।
প্রতিটি দেশের জন্য সরকারকে নির্ধারিত ও স্বচ্ছ অভিবাসন ব্যয়ের সীমা প্রকাশ করতে হবে। কোন খাতে কত টাকা লাগবে—পাসপোর্ট, মেডিকেল, প্রশিক্ষণ, ভিসা, বিমানভাড়া, নিয়োগ ফি—সবকিছু অনলাইনে প্রকাশ করা যেতে পারে।
একজন শ্রমিক যেন বিদেশ যাওয়ার আগে জানতে পারেন, তার কাছ থেকে বৈধভাবে সর্বোচ্চ কত টাকা নেওয়া যাবে।
দালাল ও প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চাই
প্রবাসী শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় বিদেশের মালিক নয়; বরং নিজের দেশের দালাল ও প্রতারক চক্র।
ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতি, অতিরিক্ত টাকা আদায়, ভুয়া ভিসা, পাসপোর্ট আটকে রাখা কিংবা চাকরির শর্ত পরিবর্তনের মতো অভিযোগ বহুদিনের।
এখানে শুধু অভিযান চালালেই হবে না। প্রয়োজন একটি কার্যকর ডিজিটাল নিয়োগব্যবস্থা।
প্রতিটি বিদেশি চাকরির বিজ্ঞপ্তি সরকারি প্ল্যাটফর্মে যাচাই করা থাকতে হবে। কোন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান শ্রমিক নিচ্ছে, বেতন কত, কাজের সময় কত, আবাসন আছে কি না, চিকিৎসা সুবিধা কী—সব তথ্য শ্রমিক বিদেশ যাওয়ার আগেই জানতে পারবেন।
নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
রাষ্ট্র যদি একজন শ্রমিককে বিদেশে পাঠায়, তবে তাকে অনিশ্চয়তার হাতে ছেড়ে দেওয়া চলবে না।
পাসপোর্ট সেবা হতে হবে দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত
প্রবাসীদের অন্যতম মৌলিক দাবি হলো দ্রুত পাসপোর্ট সেবা।
বিদেশে কর্মরত একজন ব্যক্তির পাসপোর্ট তার পরিচয়, কর্মসংস্থান ও চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। পাসপোর্ট নবায়নে অযথা বিলম্ব হলে চাকরি, ভিসা, বৈধ অবস্থান—সবকিছু ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ কারণেই প্রবাসীদের জন্য আলাদা দ্রুতগতির পাসপোর্ট সেবা চালু করা যেতে পারে।
অনলাইন আবেদন, দূতাবাসে নির্ধারিত সময়ের সেবা, আবেদন ট্র্যাকিং এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত।
২০২৬ সালে সংসদে প্রবাসীদের পাসপোর্ট নবায়ন ও প্রশাসনিক সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির মাধ্যমে সেবা সমন্বয়ের উদ্যোগের কথাও সরকার জানিয়েছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে সেটি হবে ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে প্রবাসীদের প্রয়োজন ফলাফল—শুধু কমিটি নয়।
দূতাবাসকে হতে হবে প্রবাসীর শেষ আশ্রয়
বিদেশে কোনো বাংলাদেশি শ্রমিক বিপদে পড়লে তার প্রথম ভরসা হওয়া উচিত বাংলাদেশের দূতাবাস বা কনস্যুলেট।
কিন্তু বাস্তবে অনেক শ্রমিক ভাষাগত সমস্যা, আইনি জটিলতা, নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ কিংবা বেতন না পাওয়ার ঘটনায় কোথায় যাবেন—তা জানেন না।
প্রতিটি দূতাবাসে ২৪ ঘণ্টার জরুরি হটলাইন, আইনি সহায়তা, শ্রমিক অভিযোগ সেল এবং জরুরি আশ্রয় ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা দরকার।
শুধু অফিস থাকা যথেষ্ট নয়। প্রবাসী যেন নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন—‘আমি বিপদে পড়লে বাংলাদেশ সরকার আমার পাশে দাঁড়াবে।’
এই বিশ্বাস তৈরি করাই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
বিদেশে শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় দ্বিপাক্ষিক চুক্তি জরুরি
বাংলাদেশের শ্রমিকরা যেসব দেশে যান, সেসব দেশের সঙ্গে কার্যকর দ্বিপাক্ষিক শ্রমচুক্তি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
চুক্তিতে থাকতে হবে—
- ন্যূনতম বেতন;
- কর্মঘণ্টা;
- ওভারটাইম;
- আবাসন;
- চিকিৎসা;
- পাসপোর্টের নিরাপত্তা;
- চাকরি পরিবর্তনের অধিকার;
- বেতন না পেলে অভিযোগের ব্যবস্থা;
- দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ;
- দেশে ফেরার ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রমচুক্তির উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। ২০২৬-২৭ বাজেটেও শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘কতজন শ্রমিক বিদেশ গেলেন’ নয়—‘কতজন নিরাপদ, দক্ষ ও ন্যায্য মজুরিতে কাজ করছেন’।
প্রবাসী কার্ড: উদ্যোগটি যেন শুধু একটি কার্ডে সীমাবদ্ধ না থাকে
সরকার ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা করেছে। এতে শ্রমিকের ব্যক্তিগত তথ্য, দক্ষতা ও চাকরির তথ্য সংরক্ষণ এবং ব্যাংকিং, বীমা, জরুরি সহায়তা ও অন্যান্য কল্যাণসেবার সঙ্গে সংযোগের কথা বলা হয়েছে।
এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
তবে প্রবাসী কার্ড যেন আরেকটি পরিচয়পত্রে পরিণত না হয়। এটি হতে হবে একজন প্রবাসীর পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্ম।
একটি কার্ড বা ডিজিটাল প্রোফাইল থেকেই তিনি যেন দেখতে পারেন—
তার পাসপোর্টের অবস্থা, কর্মসংস্থানের তথ্য, বীমা, ব্যাংকিং সুবিধা, সরকারি সহায়তা, অভিযোগের অবস্থা, জরুরি যোগাযোগ এবং দেশে ফেরার প্রয়োজনীয় তথ্য।
তাহলেই এটি সত্যিকার অর্থে ‘প্রবাসী সেবা কার্ড’ হবে।
রেমিট্যান্স পাঠানোকে আরও সহজ করতে হবে
সরকার যখন প্রবাসীদের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত করছে, তখন সেই চ্যানেলকে আরও দ্রুত, সস্তা এবং সহজ করতে হবে।
একজন শ্রমিক কেন হুন্ডির দিকে যাবেন?
যদি বৈধ পথে টাকা পাঠাতে বেশি সময় লাগে, চার্জ বেশি হয় বা প্রাপকের কাছে পৌঁছাতে জটিলতা থাকে, তাহলে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের আকর্ষণ বাড়তে পারে।
তাই ব্যাংক ও বৈধ মানি ট্রান্সফার সেবার মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ানো দরকার। দ্রুত লেনদেন, কম চার্জ, স্বচ্ছ বিনিময় হার এবং সহজ ডিজিটাল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ রেমিট্যান্স–যোদ্ধাকে শুধু ‘টাকা পাঠাও’ বলা যাবে না; তাকে টাকা পাঠানোর জন্য একটি সম্মানজনক ও সহজ ব্যবস্থা দিতে হবে।
প্রবাসীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা
বছরের পর বছর বিদেশে শ্রম দেওয়ার পর একজন প্রবাসী দেশে ফিরে এসে যদি চিকিৎসার জন্য অসহায় হয়ে পড়েন, তাহলে রাষ্ট্রের কল্যাণব্যবস্থায় বড় একটি শূন্যতা থেকে যায়।
প্রবাসীদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী চিকিৎসা, বীমা এবং অবসরকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে।
সরকার ইতোমধ্যে প্রবাসীদের জন্য সাশ্রয়ী ও অগ্রাধিকারভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
এ ধরনের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে প্রবাসীরা বুঝতে পারবেন—দেশ তাদের শুধু উপার্জনের সময় মনে রাখে না; তাদের জীবনের কঠিন সময়েও পাশে থাকে।
মৃত প্রবাসীর মরদেহ দেশে ফেরানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন একজন প্রবাসী শ্রমিক বিদেশের মাটিতে মারা যান।
একটি পরিবার তখন শুধু একজন মানুষকে হারায় না; অনেক সময় তাদের আয়ের প্রধান উৎসও হারিয়ে যায়।
মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া দ্রুত, সম্মানজনক ও সম্পূর্ণ হয়রানিমুক্ত হওয়া উচিত। পরিবারের সদস্যদের যেন এক অফিস থেকে অন্য অফিসে ঘুরতে না হয়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বিদেশে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশি শ্রমিকদের মরদেহ দ্রুত ও মর্যাদার সঙ্গে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে।
এটি বাস্তবায়ন করা জরুরি।
কারণ একজন প্রবাসী জীবিত অবস্থায় দেশের অর্থনীতিকে দিয়েছেন; মৃত্যুর পর অন্তত রাষ্ট্রের কাছ থেকে তার পরিবারের প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত হওয়া উচিত।
ফেরত আসা শ্রমিকদের ভুলে গেলে চলবে না
সব প্রবাসী সারাজীবন বিদেশে থাকতে পারেন না।
কেউ চাকরি হারান, কেউ অসুস্থ হয়ে ফেরেন, কেউ বয়সের কারণে দেশে ফিরে আসেন, কেউ আবার প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন।
এই মানুষগুলোর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দেশের সম্পদ।
তাদের জন্য পুনর্বাসন ঋণ, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, দক্ষতার স্বীকৃতি, চাকরি এবং সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
সরকারের বর্তমান পরিকল্পনাতেও ফেরত আসা শ্রমিকদের দক্ষতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একজন প্রবাসী যেন দেশে ফিরে নিজেকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ মনে না করেন।
সরকারের কাছে রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের ১০টি মৌলিক দাবি
১. বিমানবন্দরে প্রবাসীদের সঙ্গে সম্মানজনক ও হয়রানিমুক্ত আচরণ নিশ্চিত করা।
২. পাসপোর্ট নবায়ন ও অন্যান্য সরকারি সেবা দ্রুত করা।
৩. বিদেশ যাওয়ার অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং সব খরচ প্রকাশ্যে আনা।
৪. দালাল ও প্রতারক নিয়োগ সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
৫. প্রতিটি বিদেশি চাকরির বেতন ও শর্ত সরকারি প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা।
৬. দূতাবাসগুলোতে ২৪ ঘণ্টার জরুরি সহায়তা ও আইনি সেবা শক্তিশালী করা।
৭. শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর দ্বিপাক্ষিক শ্রমচুক্তি করা।
৮. রেমিট্যান্স পাঠানোর বৈধ পথকে আরও দ্রুত, সস্তা ও সহজ করা।
৯. প্রবাসীদের জন্য স্বাস্থ্য, বীমা ও সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা বাড়ানো।
১০. দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
এখন দরকার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন
প্রবাসীদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগের কথা বলেছে। কিন্তু এবার প্রয়োজন এমন একটি স্থায়ী কাঠামো, যেখানে সরকার পরিবর্তন হলেও প্রবাসী কল্যাণনীতি পরিবর্তনের শিকার হবে না।
২০২৬-২০৩০ সালের জাতীয় কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসনকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও জানিয়েছে।
এখন সেই পরিকল্পনার প্রতিটি লক্ষ্যকে পরিমাপযোগ্য করতে হবে।
কত টাকা অভিবাসন ব্যয় কমানো হলো?
কতজন প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পেলেন?
কতটি অভিযোগ নিষ্পত্তি হলো?
কতজন শ্রমিককে আইনি সহায়তা দেওয়া হলো?
কত দ্রুত পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে?
কতজন ফেরত আসা শ্রমিক পুনর্বাসিত হলেন?
এই তথ্যগুলো জনগণের সামনে নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত।
শেষ কথা: রেমিট্যান্স শুধু ডলার নয়, মানুষের ঘাম
রেমিট্যান্সের হিসাব করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই শুধু ডলারের অঙ্ক দেখি।
কিন্তু প্রতিটি ডলারের পেছনে রয়েছে একজন মানুষের শ্রম।
কোনো মা তার ছেলেকে বিদায় দিয়েছেন। কোনো স্ত্রী বছরের পর বছর স্বামীকে ছাড়া সংসার চালিয়েছেন। কোনো বাবা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য বিদেশে গেছেন। কোনো তরুণ নিজের জীবন বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে অপরিচিত দেশে পাড়ি দিয়েছেন।
তাদের পাঠানো অর্থে পরিবারের ঘর তৈরি হয়েছে, সন্তানের পড়াশোনা হয়েছে, চিকিৎসা হয়েছে, ব্যবসা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিও শক্তি পেয়েছে।
তাই রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের দাবিকে ‘সুবিধা দেওয়ার দাবি’ হিসেবে দেখা ভুল।
এগুলো তাদের অধিকার।
রাষ্ট্র যদি তাদের শ্রম থেকে অর্থনৈতিক শক্তি পায়, তবে তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
একজন প্রবাসী যখন বিদেশে বাংলাদেশের পতাকার পরিচয় বহন করেন, তখন তিনি শুধু নিজের পরিবারের প্রতিনিধি নন—তিনি বাংলাদেশেরও প্রতিনিধি।
সুতরাং তার সঙ্গে প্রতারণা হলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার সঙ্গে অন্যায় হলে রাষ্ট্রের দায় তৈরি হয়। আর তার প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত হলে বাংলাদেশের মর্যাদাই বাড়ে।
আজ সময় এসেছে প্রবাসীদের শুধু ‘রেমিট্যান্স পাঠানোর মানুষ’ হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অংশীদার ও রেমিট্যান্স–যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার।
সরকারের কাছে তাই দাবি একটাই—
রেমিট্যান্স চাইলে রেমিট্যান্স–যোদ্ধার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ তাদের দাবিগুলো পূরণ করা শুধু অর্থনীতির প্রয়োজন নয়, শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়—এটি সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু তার রিজার্ভের পরিমাণে মাপা যায় না; সেই রিজার্ভ তৈরিতে অবদান রাখা মানুষের মর্যাদা কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে, সেটিও রাষ্ট্রের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
রেমিট্যান্স–যোদ্ধাদের সম্মান করুন। তাদের অধিকার নিশ্চিত করুন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।
কারণ তারা দেশের বাইরে থাকলেও—তাদের ঘাম, শ্রম ও ভালোবাসা প্রতিদিন বাংলাদেশেই ফিরে আসে।
