● LIVE
Bangladesh

ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্ব—যোগ্যতা না নৈতিকতার পরীক্ষা

Author: Published: Updated: 27/08/2026 Comments: 0 Estimated reading time: 1 min read
ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্ব—যোগ্যতা না নৈতিকতার পরীক্ষা

১৯৮৪ থেকে ২০২৬: উত্থান, সাফল্য, সংকট, নিয়ন্ত্রণ বদল এবং নেতৃত্বের নৈতিকতার দীর্ঘ ইতিহাস


১. ইসলামী ব্যাংকের জন্ম: একটি নতুন অর্থনৈতিক ধারণার সূচনা

ইসলামী ব্যাংকের গল্প শুরু হয় ১৯৮৩ সালের মার্চে। ব্যাংকটি ১৩ মার্চ ১৯৮৩ কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় এবং ৩০ মার্চ কার্যক্রম শুরু করে। একই বছর শরিয়াহ কাউন্সিল গঠন এবং ১২ আগস্ট আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। পরবর্তী ১৯৮৪ সালে ইসলামী ব্যাংক ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এই সময় বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকিং ছিল নতুন ধারণা। সুদবিহীন ব্যাংকিং, মুদারাবা, মুশারাকা, বাই-মুয়াজ্জালসহ শরিয়াহসম্মত আর্থিক পদ্ধতিকে বাস্তব ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

১৯৮২ সালে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে। এর আগে থেকেই ইসলামী অর্থনীতি গবেষণা ব্যুরো এবং বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য জনমত, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত প্রস্তুতির কাজ করছিল। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশি উদ্যোক্তা, প্রতিষ্ঠান এবং মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকের ভিত্তি কেবল ব্যবসায়িক লাভের ওপর ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি নৈতিক ও ধর্মীয় অর্থনৈতিক দর্শন

এ কারণেই ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্বের প্রশ্ন অন্য অনেক ব্যাংকের তুলনায় আলাদা গুরুত্ব বহন করে।


২. ১৯৮৪–১৯৮৯: প্রতিষ্ঠান গঠনের সময়

১৯৮৪ সালে প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি চালু করা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ নতুন ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল প্রয়োজন ছিল।

১৯৮৫ সালে ব্যাংকটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় এবং একই বছরের জুলাইয়ে IPO সম্পন্ন করে। ১৯৮৯ সালে প্রথম রাইট শেয়ার ইস্যু করা হয়।

এই সময়ের নেতৃত্বের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল—একদিকে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা, অন্যদিকে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা।

এখানেই ইসলামী ব্যাংকের প্রথম শিক্ষা:

প্রতিষ্ঠানের আদর্শ যত মহৎই হোক, দক্ষ নেতৃত্ব ছাড়া তা টেকসই হয় না।

আবার দক্ষতা থাকলেও যদি সততা না থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠানের আদর্শ ধীরে ধীরে কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।


৩. ১৯৯০-এর দশক: শাখা বিস্তার ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো

১৯৯০-এর দশকে ইসলামী ব্যাংক দ্রুত সম্প্রসারণ শুরু করে। ১৯৯৫ সালে Rural Development Scheme বা RDS চালু হয়। ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় রাইট শেয়ার ইস্যু এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তি ঘটে। ১৯৯৭ সালে ব্যাংকটির ১০০তম শাখা চালু হয়। ২০০০ সালে তৃতীয় রাইট শেয়ার ইস্যু এবং নিজস্ব প্রধান কার্যালয় ভবনে কার্যক্রম শুরু হয়।

এই সময় ইসলামী ব্যাংক শুধু বড় ব্যবসায়ী বা শহুরে গ্রাহকদের ব্যাংক হওয়ার পথে থাকেনি; ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছেও ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে।

এখানে নেতৃত্বের আরেকটি পরীক্ষার জায়গা ছিল—ব্যাংকের ইসলামী চরিত্রকে ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা যায়।


৪. ২০০১–২০১০: বড় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর

২০০০-এর দশকে ইসলামী ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি আরও দ্রুত হয়। ২০০৪ সালে Central Depository Bangladesh-এ যোগদান, ২০০৫ সালে নিজস্ব Core Banking Software, ২০০৭ সালে প্রথম Mudaraba Perpetual Bond এবং একই সময় থেকে জাতীয় পর্যায়ে inward remittance-এ শীর্ষ অবস্থান ব্যাংকটির সক্ষমতার পরিচয় দেয়। ২০০৯ সালে ২০০তম শাখা এবং ২০১০ সালে ইসলামী ব্যাংক ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ও ইসলামী ব্যাংক সিকিউরিটিজ প্রতিষ্ঠিত হয়।

অর্থাৎ দুই দশকেরও কম সময়ে একটি নতুন ধারণার ব্যাংক একটি বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

এখানে নেতৃত্বের সাফল্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান যত বড় হয়, তার ঝুঁকিও তত বড় হয়।

একটি ছোট ব্যাংকে ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব সীমিত থাকতে পারে; কিন্তু দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকে ভুল নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত হাজার হাজার কোটি টাকার আমানত, লাখ লাখ গ্রাহক এবং জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।


৫. ২০১১–২০১৬: আস্থার শীর্ষে ইসলামী ব্যাংক

২০১১ সালে পুরো শাখা নেটওয়ার্ক অনলাইনে আসে। ২০১২ সালে iBanking, মুঠোফোনভিত্তিক mCash এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১২ সালেই ব্যাংকটি বিশ্বের Top 1,000 Banks-এর তালিকায় প্রবেশ করে। ২০১৪ সালে আমানত হিসাবের সংখ্যা এক কোটিতে পৌঁছে এবং আমানতের পরিমাণ ৫০০ বিলিয়ন টাকার সীমা অতিক্রম করে।

২০১৬ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা বলে পরবর্তী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকটি দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অন্যতম হিসেবে অবস্থান সুদৃঢ় করেছিল।

এটি ছিল ইসলামী ব্যাংকের উত্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—সাফল্যের সময়েই ভবিষ্যৎ সংকটের বীজ অনেক সময় অদৃশ্যভাবে তৈরি হয়।


৬. ২০১৭: মোড় ঘুরে গেল

২০১৭ সাল ইসলামী ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোর একটি।

বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছরের জানুয়ারিতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং এস আলম গ্রুপের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। Prothom Alo-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৫ জানুয়ারি ২০১৭-এর একটি বোর্ড সভায় ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল এবং পরে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কারণ কোনো ব্যাংকের মালিকানা বা পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তন যদি স্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের মাধ্যমে হয়, তাহলে সেখানে প্রশ্ন উঠে যায়—ব্যাংকটি আসলে কার স্বার্থে পরিচালিত হবে?

২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের ওপর এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও অভিযোগ তৈরি হয়।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপে যে অভিযোগগুলো উঠে এসেছে, সেগুলোকে আদালতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখা উচিত নয়। কিন্তু অভিযোগগুলোর ব্যাপ্তি এত বড় যে সুশাসনের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।


৭. নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা: স্বাধীনতা

একজন চেয়ারম্যানের যোগ্যতা শুধু তার শিক্ষাগত ডিগ্রি বা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় নির্ধারিত হয় না।

একজন ব্যাংকারের সবচেয়ে বড় যোগ্যতার একটি হলো—তিনি কি ক্ষমতাবান মালিক বা রাজনৈতিক ব্যক্তির সামনে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ‘না’ বলতে পারেন?

২০১৭ সালের পর ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে যে ঘটনাপ্রবাহ সামনে এসেছে, সেটি এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

Prothom Alo-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, তৎকালীন চেয়ারম্যান আরাস্তু খান ব্যাংকের অর্থ ফেরত আনা এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের অপসারণের বিষয়ে চাপের মুখে পড়েছিলেন বলে পরে দাবি করেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।

যদি একজন চেয়ারম্যান সত্যিই প্রতিষ্ঠানের অর্থ বা কর্মকর্তাদের বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন, তাহলে সেই পদে বসে থাকা আর নেতৃত্ব দেওয়া—দুটো এক জিনিস নয়।

চেয়ারম্যানের চেয়ার তখন প্রতিষ্ঠানের রক্ষাকবচ না হয়ে আনুষ্ঠানিকতার আসনে পরিণত হয়।


৮. ২০১৭–২০২৩: প্রবৃদ্ধির আড়ালে জমতে থাকা সংকট

এই সময় ইসলামী ব্যাংক একই সঙ্গে বড় হয়েছে এবং বিতর্কের মুখেও পড়েছে।

ব্যাংকটির নিজস্ব ইতিহাসে দেখা যায়, ২০১৭ সালে প্রথম agent banking outlet চালু হয়, ২০১৯ সালে ১,০০০ এবং ২০২০ সালে ২,০০০ agent banking outlet-এর মাইলফলক অর্জিত হয়। ২০২০ সালে আমানত এক ট্রিলিয়ন টাকা ছাড়িয়ে যায়।

অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে ব্যাংকটি বিস্তার লাভ করছিল।

কিন্তু ব্যাংকের মূল শক্তি শাখা বা আমানতের সংখ্যা নয়—ঋণের মান এবং সেই ঋণের যথাযথ ব্যবস্থাপনা।

২০২৩ সালের দিকে ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক-নিযুক্ত নিরীক্ষা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে।

২০২৬ সালের একটি Daily Star অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১,৮৭,৯৫৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে।

এই সংখ্যা শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়।

এটি প্রশ্ন তোলে—একটি ব্যাংকের ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, পরিচালনা পর্ষদ, অডিট কমিটি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি কোথায় ছিল?


৯. ২০২৪: পুরনো অধ্যায়ের অবসান

৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোও বদলে যায়।

২২ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের আগের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করে। সাবেক রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে চেয়ারম্যান করা হয় এবং পাঁচজন স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। BSS-এর প্রতিবেদনে এটিকে এস আলম গ্রুপের প্রায় সাত বছরের নিয়ন্ত্রণের অবসান হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

এই পরিবর্তন ছিল শুধু একটি বোর্ড পরিবর্তন নয়।

এটি ছিল ব্যাংকের মালিকানা ও নেতৃত্বের দর্শন পরিবর্তনের চেষ্টা।

নতুন নেতৃত্বের সামনে তখন তিনটি বড় দায়িত্ব ছিল:

১. আমানতকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা।
২. অনিয়মিত ঋণ ও সম্পদের প্রকৃত অবস্থা নির্ণয় করা।
৩. ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে ব্যাংককে নিজের আর্থিক সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত করতে না পারে, সেই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।


১০. ২০২৫: পুনর্গঠনের চেষ্টা

২০২৫ সালে ব্যাংক নতুন বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।

ব্যাংকের ৪২তম AGM-এ চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম জুবাইদুর রহমান বলেন, একটি গোষ্ঠী ব্যাংকটির ভিত্তি দুর্বল করেছিল এবং ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর গঠিত নতুন বোর্ডের মাধ্যমে ব্যাংক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয়। ব্যাংকের নিজস্ব বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রাহক ও সাধারণ মানুষের আস্থা এবং কর্মীদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল।

কিন্তু ব্যাংক পুনর্গঠন মানে শুধু নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নয়।

প্রকৃত পুনর্গঠন হলো:

খেলাপি ঋণের প্রকৃত হিসাব প্রকাশ করা, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, রাজনৈতিক প্রভাব থেকে ব্যাংককে মুক্ত রাখা এবং পরিচালনা পর্ষদকে সত্যিকারের স্বাধীন করা।


১১. ২০২৬: আবার নেতৃত্বের প্রশ্ন

২০২৬ সালে এসে ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্বের ইতিহাস আবারও নাটকীয় মোড় নেয়।

এপ্রিল ২০২৬-এর একটি ব্যাংক-প্রকাশিত তালিকায় অধ্যাপক ড. এম জুবাইদুর রহমানকে চেয়ারম্যান এবং মো. ওমর ফারুক খানকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

কিন্তু মে ২০২৬-এ বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশিদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়।

এরপর জুন ২০২৬-এ বাংলাদেশ ব্যাংক আবার পুরো বোর্ড ভেঙে দিয়ে নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেয়। Daily Star-এর প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্তের পেছনে তীব্র তারল্য সংকট, আমানত প্রত্যাহার ও অন্যান্য বিতর্কের কথা উল্লেখ করা হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে:

একটি ব্যাংক যখন বারবার নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তখন শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন হয় না—প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে আগস্ট ২০২৬-এর সর্বশেষ ব্যাংক-প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৭ আগস্টের বোর্ড সভায় মোহাম্মদ জহির হোসেন চেয়ারম্যান হিসেবে সভায় সভাপতিত্ব করেছেন এবং মো. আলতাফ হোসেন Managing Director (Acting) হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

অর্থাৎ ২০২৬ সালের মধ্যেই ইসলামী ব্যাংক আবার একটি নতুন নেতৃত্ব কাঠামোর দিকে এগিয়েছে।


১২. তাহলে প্রশ্নটি কী—যোগ্যতা না নৈতিকতা?

আসলে উত্তরটি যোগ্যতা বনাম নৈতিকতা নয়।

উত্তর হলো—

যোগ্যতা + নৈতিকতা + স্বাধীনতা + জবাবদিহি।

একজন চেয়ারম্যান অত্যন্ত শিক্ষিত হতে পারেন, কিন্তু যদি তিনি মালিকের অনৈতিক নির্দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারেন, তাহলে তার যোগ্যতা অসম্পূর্ণ।

একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বহু বছরের অভিজ্ঞ ব্যাংকার হতে পারেন, কিন্তু যদি তিনি ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ অনুমোদনের সময় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের বদলে কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপজ্জনক।

একজন পরিচালক সৎ মানুষ হতে পারেন, কিন্তু ব্যাংকের হিসাব, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ বিশ্লেষণ সম্পর্কে যদি তার পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকে, তাহলেও তিনি কার্যকর পরিচালক নন।

তাই ব্যাংকের নেতৃত্বে প্রয়োজন চারটি স্তম্ভ:

দক্ষতা।
সততা।
স্বাধীন সিদ্ধান্ত।
জবাবদিহি।


১৩. ইসলামী ব্যাংকের জন্য নৈতিকতার গুরুত্ব আরও বেশি

ইসলামী ব্যাংক নামটির মধ্যেই একটি নৈতিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

গ্রাহক যখন ইসলামী ব্যাংকে অর্থ রাখেন, তিনি শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখেন না; তিনি মনে করেন তার অর্থ শরিয়াহসম্মত ও নৈতিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে।

তাই কোনো অনৈতিক ঋণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বার্থের সংঘাত বা রাজনৈতিক প্রভাব ইসলামী ব্যাংকের জন্য দ্বিগুণ ক্ষতিকর।

কারণ এতে শুধু টাকা হারায় না—আস্থাও হারায়।

আর ব্যাংকিং ব্যবসায় সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো আস্থা।

টাকা হারালে পুনরুদ্ধার সম্ভব।

কিন্তু মানুষের বিশ্বাস হারালে একটি ব্যাংককে পুনর্গঠন করতে বহু বছর লেগে যেতে পারে।


১৪. ১৯৮৪ থেকে ২০২৬: ইতিহাসের আয়নায় কয়েকটি শিক্ষা

চার দশকের ইতিহাসকে যদি কয়েকটি বাক্যে সংক্ষেপ করা হয়, তাহলে দেখা যায়—

প্রথম পর্যায়: আদর্শ ও প্রতিষ্ঠান গঠন।

দ্বিতীয় পর্যায়: শাখা বিস্তার ও জনসম্পৃক্ততা।

তৃতীয় পর্যায়: প্রযুক্তি, আমানত ও ব্যবসায়িক সাফল্য।

চতুর্থ পর্যায়: নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্বের বড় পরিবর্তন।

পঞ্চম পর্যায়: ঋণ বিতরণ, সুশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ।

ষষ্ঠ পর্যায়: ২০২৪-এর পর পুনর্গঠনের চেষ্টা।

সপ্তম পর্যায়: ২০২৬ সালে আবার নেতৃত্ব ও তারল্য সংকটের পরীক্ষা।

এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে—কোনো প্রতিষ্ঠান একবার সফল হলেই চিরদিন সফল থাকে না।

প্রতিষ্ঠানের সাফল্যকে প্রতিদিন রক্ষা করতে হয়।


১৫. ভবিষ্যতের ইসলামী ব্যাংক কেমন হওয়া উচিত?

ইসলামী ব্যাংককে পুনর্গঠন করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী পরিচালনা পর্ষদ

পরিচালকদের হতে হবে এমন ব্যক্তি, যারা কোনো রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ বিসর্জন দেবেন না।

দ্বিতীয়ত, ঋণ বিতরণে কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

একজন বড় ব্যবসায়ী যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, তার ঋণ ব্যাংকের মোট ঝুঁকির এমন পর্যায়ে যেতে দেওয়া উচিত নয় যাতে সেই গ্রাহকের সমস্যা হলে পুরো ব্যাংক বিপদে পড়ে।

তৃতীয়ত, Related Party Transaction বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেনে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা প্রয়োজন।

চতুর্থত, পরিচালনা পর্ষদের Audit Committee এবং Risk Management Committee-কে সত্যিকারের স্বাধীন হতে হবে।

পঞ্চমত, শেয়ারহোল্ডারদের কাছে তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতি শক্তিশালী করতে হবে।

ষষ্ঠত, ব্যাংকের কর্মীদের এমন পরিবেশ দিতে হবে যেখানে তারা অনিয়ম দেখলে ভয় ছাড়া তা রিপোর্ট করতে পারেন।

আর সপ্তমত—শরিয়াহ বোর্ডকে কেবল আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় অনুমোদনদাতা হিসেবে নয়, ব্যাংকের নৈতিক আর্থিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কার্যকর করতে হবে।


১৬. নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা সংকটের সময়ে

সুসময়ে নেতৃত্ব দেওয়া সহজ।

যখন ব্যাংকের মুনাফা বাড়ে, আমানত বাড়ে, শাখা বাড়ে, তখন একজন চেয়ারম্যানকে সফল মনে হওয়া স্বাভাবিক।

কিন্তু আসল নেতৃত্বের পরীক্ষা হয় তখন, যখন—

  • বড় ঋণগ্রহীতা টাকা ফেরত দেয় না,
  • তারল্য সংকট দেখা দেয়,
  • রাজনৈতিক চাপ আসে,
  • কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি সুবিধা দাবি করেন,
  • পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে ব্যবস্থাপনার মতবিরোধ হয়,
  • কিংবা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ বনাম ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

সেই মুহূর্তে যে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন, তিনিই প্রকৃত নেতা।


১৭. ইসলামী ব্যাংকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব

২০২৬ সালের বাস্তবতায় ইসলামী ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো আস্থা পুনর্গঠন

এটি শুধু বিজ্ঞাপন দিয়ে সম্ভব নয়।

গ্রাহককে বিশ্বাস করাতে হবে যে তার টাকা নিরাপদ।

শেয়ারহোল্ডারকে বোঝাতে হবে যে প্রতিষ্ঠানটি সুশাসনের পথে ফিরছে।

কর্মীদের বোঝাতে হবে যে যোগ্যতা ও সততা মূল্যায়নের ভিত্তি হবে।

আর জনগণকে দেখাতে হবে—কোনো ব্যক্তি, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক শক্তি আর ব্যাংকের ওপর এমন প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না, যা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে দুর্বল করে।


উপসংহার: ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নেতৃত্বের চরিত্রের ওপর

১৯৮৩ সালে যাত্রা শুরু করা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ আজ চার দশকেরও বেশি সময় পার করেছে। ১৯৮৪ সালে প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠান নিজস্ব মানবসম্পদ ও ধারণাগত ভিত্তি তৈরি করেছিল, সেটি পরবর্তীতে শত শত শাখা, কোটি কোটি গ্রাহক, বিপুল আমানত এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।

কিন্তু একই ইতিহাস আমাদের আরেকটি কঠিন সত্যও দেখায়।

একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য যত বড় হয়, নেতৃত্বের নৈতিক ব্যর্থতার ক্ষতিও তত গভীর হয়।

ইসলামী ব্যাংকের ইতিহাস তাই কেবল একটি ব্যাংকের ইতিহাস নয়।

এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যোগ্যতা, নৈতিকতা, রাজনৈতিক প্রভাব, মালিকানা, সুশাসন এবং জবাবদিহির সম্পর্কের একটি বড় উদাহরণ।

আজকের প্রশ্ন তাই হওয়া উচিত নয়—

“কে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান?”

প্রশ্ন হওয়া উচিত—

“চেয়ারম্যান কি স্বাধীন?”

প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—

“ব্যবস্থাপনা পরিচালক কত বছরের অভিজ্ঞ?”

প্রশ্ন হওয়া উচিত—

“তিনি কি চাপের মুখেও ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবেন?”

প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—

“পরিচালক কত বড় ব্যক্তি?”

প্রশ্ন হওয়া উচিত—

“তিনি কি আমানতকারীর অর্থের প্রতি নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ?”

কারণ একটি ব্যাংকের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা শুধু জ্ঞান নয়।

সততা।

সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু ক্ষমতা নয়।

স্বাধীনতা।

সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু মুনাফা নয়।

আমানতকারীর আস্থা।

আর ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু টাকা নয়—

নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা।

১৯৮৪ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ পথচলা ইসলামী ব্যাংককে সেই কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে:

নেতৃত্ব কি ক্ষমতার আসন, নাকি আমানতের দায়িত্ব?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ইসলামী ব্যাংকের পরবর্তী অধ্যায়—আর সেই উত্তর শুধু চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেবেন না; দেবেন পুরো পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সর্বোপরি প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বের নৈতিক চরিত্র।

✍️ বিশেষ মতামত

ইসলামী ব্যাংক—নামটির মধ্যেই একটি গভীর দায়বদ্ধতা লুকিয়ে আছে। এটি শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং একটি আদর্শ, একটি বিশ্বাস এবং একটি আমানত। এখানে জমা থাকে শুধু অর্থ নয়—মানুষের আস্থা, নৈতিকতা এবং আল্লাহভীতির উপর প্রতিষ্ঠিত একটি অর্থনৈতিক দর্শন।

এই ব্যাংকের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে সুদমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির ওপর। তাই এর পরিচালনা যদি লোভ, ক্ষমতা বা ব্যক্তিস্বার্থের হাতে চলে যায়, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়—বরং একটি আদর্শের অবমূল্যায়ন।

main Editor July36bd

July36 Editorial Team

Leave a Comment